রথীন্দ্রকান্ত ঘটক চৌধুরী

রথীন্দ্রকান্ত ঘটক চৌধুরী(১৯২১-১৯৮৪)

জন্ম ও পরিচয়

বিখ্যাত সাহিত্যিক, সাংবাদিক  ও রাজনীতিবিদ রথীন্দ্রকান্ত ঘটক চৌধুরী ১৯২১ সালের ২৬ শে ডিসেম্বর (বাংলা ১১ পৌষ ১৩২৮) শরীয়তপুর জেলার পালং  থানার দক্ষিণ বালুচর গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তার পিতার নাম সূর্যকান্ত ঘটক চৌধুরী ও মাতার নাম রত্নাবালা দেবী। সূর্যকান্ত ঘটক চৌধুরী ছিলেন ঐ অঞ্চলের জমিদার। তার ছিল দশ সন্তান(রবীন্দ্রকান্ত, মঙ্গলা, রথীন্দ্রকান্ত, ঊষা, উজ্জলা, কমলা, বেলা, রমেন্দ্র, গীতা, দীপেন্দ্র।  তাদের মধ্যে রথীন্দ্রকান্ত ঘটক চৌধুরী ছিল তৃতীয়। রথীন্দ্রকান্ত ঘটক চৌধুরীর দাদা (সূর্যকান্ত ঘটক চৌধুরীর বাবা) রজনীকান্ত ঘটক চৌধুরী ছিলেন পালং এর বিখ্যাত জমিদার এবং তার পেশা ছিল ওকালতি। তবে রজনীকান্তের পূর্বের বাড়ি ছিল নড়িয়া উপজেলার রাজনগরে। পরবর্তীতে তারা বর্তমান পালং উপজেলার বালুচর গ্রামে স্থায়ী নিবাস গড়েন।  সে সময় বালুচর গ্রাম ছিল ঢাকা জেলার কলাগাছিয়া থানার অন্তর্গত।

শিক্ষা জীবন

রথীন্দ্রকান্ত ঘটক চৌধুরীর শিক্ষা জীবন শুরু হয় তুলাসার গুরুদাস উচ্চ ইংরেজী বিদ্যালয় থেকে। ১৯৩৯ সালে তিনি এ বিদ্যালয় থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাশ করেন। এ বিদ্যালয়ে তিনি শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, লেখক ও কলকাতা থেকে প্রকাশিত  ‘অরণি’ ও ‘অগ্রণী’ পত্রিকার সম্পাদক স্বর্ণকমল ভট্টাচার্যকে। প্রবেশিকা পাশ করার পর বাংলা ১৩৪৪ সালে তিনি ভর্তি হন শান্তিনিকেতনে। শান্তিনিকেতনে পড়া শেষে ১৯৪১ সালে রথীন্দ্রকান্ত ভর্তি হন কলকাতার বিদ্যাসাগর কলেজে বি.এ. ক্লাসে। তবে তিনি সেখানে বি.এ. পরীক্ষা দেওয়া হয়নি ।  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কলকাতায় ব্যাপক বোমাবাজি হলে তিনি বাধ্য হয়েই দেশে ফিরে আসেন।

সাহিত্যের সূচনা

রথীন্দ্রকান্ত ঘটক চৌধুরীর বাবা ও দাদা সবাই ছিল শিক্ষিত ও সাংস্কৃতমনা। তাদের বাড়িতেই  লাইব্রেরী ছিল । তার বাবা সূর্যকান্ত ঘটক চৌধুরী চৌধুরী সারা জীবন তিলে তিলে গড়ে তুলেছেন বিশাল এক বই ভাণ্ডার। সেখানে সংরক্ষিত ছিল বাংলা ও ইংরেজি ভাষার বই ও দুর্লভ পত্র-পত্রিকা। তাই ছেলেবেলা থেকেই তিনি পড়তেন এসব বইপত্র। এছাড়া তার বড় ভাই রবীন্দ্রকান্ত ঘটক চৌধুরী পড়তেন শান্তিনিকেতনে। আর সেই সুবাদে তিনি ভাইয়ের কাছে রনীন্দ্রনাথ সম্পর্কে শুনতেন এবং তার বই খুব সহজেই পেতেন। আর এ থেকেই সাহিত্যের প্রতি তার আগ্রহ আরও  বেড়ে যায়।

রবীন্দ্র ভক্ত

রথীন্দ্রঘটক চৌধুরীর পরিবারের সবাই ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভক্ত। ১৯৬১ সালে ঢাকা শহরে রবীন্দ্র শতবার্ষিকী অনুষ্ঠান আয়োজনে রথীন্দ্রনাথের বাবা মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। তার বড় ভাই রবীন্দ্রঘটক চৌধুরী ১৯৩৭ সালের জুলাই মাসে শান্তিনিকেতনে ভর্তি হন। সেখানে তার ঘনিষ্ট সহপাঠিনী ছিল ভারতের সাবেক প্রধান মন্ত্রী ইন্দ্রিরা গান্ধী। রবীন্দ্রঘটক চৌধুরীর সাথে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে ভাল সম্পর্ক ছিল । সেখানে তিনি ছিলেন নাট্য সম্পাদক। রথীন্দ্রঘটক চৌধুরী তুলাসার গুরুদাস উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ার সময় কবি রবীন্দ্রনাথ থাকুরকে চিঠি লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত কবিতা ‘এবার ফিরাও মোরে’ এ ব্যবহৃত ‘ হৃৎপিণ্ড’ শব্দটির মাত্রা সম্পর্কে সন্দেহ নিয়ে। আর এ চিঠির উত্তর  দিয়েছিলেন  স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ । ১৯৩৯ সালের ২রা আগস্ট (বাংলা ১৩৪৬ সালের ১৭ শ্রাবন) রথীন্দ্রঘটক চৌধুরীও ভর্তি হয়েছিলেন শান্তিনিকেতনে। সেখানে তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গ পেয়েছিলেন। ১৯৪১ সালে তিনি শান্তিনিকেতনে পড়া শেষে দেশে ফিরেন। বিদায় বেলা তাকে বিদায় জানিয়েছিলেন  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং বলেছিলেন ‘আবার এসো’। তবে সে দেখাই ছিল রবীন্দ্রনাথের সাথে তার শেষ দেখা।

সমাজ সেবা ও রাজনীতি

কলকাতা থেকে বাড়ি ফিরে তিনি বসে থাকেননি। তিনি জড়িয়ে পড়েছিলেন সমাজ সেবা ও রাজনীতিতে। তবে ছাত্র জীবন থেকেই তার ছিল রাজনীতিতে হাতেখড়ি। ছাত্র অবস্থায় তিনি জড়িয়ে পড়ছিলেন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে। সে সময় তিনি জড়িত ছিলেন ‘অনুশীলন পার্টির’ সাথে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দেশে মহামারী শুরু হয়। চালের দাম বেড়ে মনে ৩০ টাকা হয়ে যায়। চালের দাম কমানোর দাবিতে রথীন্দ্রনাথ বড় ধরনের মিছিল ও মহাসমাবেশের ডাক দেন। তার এ চাপে স্থানীয় প্রশাসন চালের দাম কমিয়ে নির্ধারণ করেন ১৫ টাকা এবং বিক্রয় হয় রথীন্দ্রনাথের স্লিপের মাধ্যমে। ১৯৪৩ সালের দিকে অনেক লোক খাদ্যাভাবে মারা গেলে তার নেতৃত্বে স্থানীয় খাদ্য বিভাগ ও সার্কেল অফিসারের কাছে ‘চরমপত্র’ দেয়া হয়। তাদের চাপের মুখে প্রশাসন সেখানে একটি লঙ্গরখানা খোলেন।

১৯৪৩ সালে সিরঙ্গলে অনুষ্ঠিত ফরিদপুর জেলার ‘আঞ্চলিক পার্টি’ সম্মেলনে রথীন্দ্রকান্ত ঘটক চৌধুরী পার্টির সদস্য পদ লাভ করেন। এ পার্টির মূল লক্ষ্য ছিল গরিব ও মেহনতি মানুষের সেবা করা। ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের পর এলাকায় অনেক রোগ-বালাইয়ের  লক্ষন দেখা দিলে সে  রোগ-বালাই  প্রতিরোধের জন্য রথীন্দ্রনাথের নেতৃত্বে স্থানীয় প্রশাসনের নিকট একটি অস্থায়ী হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা ও প্রয়োজনীয় ঔষধ সরবরাহের জন্য ডেপুটেশন দেয়া হয়। তাদের দাবী মেনে নিয়ে জেলা স্বাস্থ্য অফিসার সেখানে একটি অস্থায়ী হাসপাতাল স্থাপন করেন। এরপর ভারতের ছাত্র ফেডারেশনের সম্পাদক অন্নদাশংকর ভট্টাচার্য সেখানে পাঞ্জাবী ডাক্তারের একটি টিম পাঠান।

রথীন্দ্রকান্ত ঘটক চৌধুরী কৃষকদের খুব ভালবাসতেন। সে সময় তিনি ফরিদপুরের পলদি, পালের চর, কোরফদি কৃষক সম্মেলনে যোগ দেন এবং সেখানে কৃষকদের সাথে বসেই খাওয়া দাওয়া করতেন। ১৯৪৪ সালে মাদারীপুরে অনুষ্ঠিত ফরিদপুর জেলা পার্টি সম্মেলনে তিনি জেলা সংগঠকের পদে অধিষ্ঠিত হন। ১৯৪৩ সাল থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত তিনি কৃষক, কারিগর ও তাতীদের বিভিন্ন বৈঠকে প্রধান বক্তার ভূমিকা পালন করেন। ১৯৪৫ সাল থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত তিনি তে-ভাগা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এ আন্দোলনে রথীন্দ্রসহ এগারো জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। পরবর্তীতে সবাই এ  মামলা থেকে বেকসুর খলাস পান।

১৯৪৭ সালে তুলাসার মাঠে অনুষ্ঠিত তে-ভাগা সম্মেলনে কমরেড শান্তি সেন ও রথীন্দ্রকান্ত ঘটক চৌধুরী বক্তৃতা করেন। সে সময় রথীন্দ্রনাথের আহ্বানো পাঁচ হাজার কৃষক দুহাত তুলে তে-ভাগা আন্দোলনের জন্য শপথ পাঠ করেন। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারত দ্বিখণ্ডিত হলে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি রাষ্টের জন্ম হয়। স্বাধীনতা উদযাপন করার জন্য তুলাসার মাঠে একটি জনসভা আহবান করা হয় এবং সে সভায় তিনি ঘোষণা করেন, “আমরা পাকিস্তানকে ভারতের চেয়ে গণতান্ত্রিক, সুখি ও সুন্দর রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলব’’।

১৯৪৮ সালে রথীন্দ্রকান্ত ঘটক চৌধুরীর বাড়িতে পুলিশি তল্লাসী করা হয়।এ  সময় তিনি কলকাতা চলে যান এবং কিছুদিন পরে দেশে ফিরে আসেন। তবে ১৯৪৮ সালের ২০ নভেম্বর তিনি আবার কলকাতা চলে যান। সেখানে তিনি অবস্থান করেন ১৯৫০ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত।  কলকাতায় অবস্থানকালে তার সঙ্গে পরিচয় হয় তারাশঙ্কর বন্ধোপাধ্যয়, মানিক বন্ধোপাধ্যয়, ঋতিক খটক, সমরেশ বসু, মৃনাল সেন, সুকান্ত ভট্টাচার্য সহ অনেক নামকরা কবি সাহিত্যিকের সাথে।

১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে রথীন্দ্রকান্ত ঘটক চৌধুরী স্থানীয়ভাবে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। তিনি সেখানে লোকদের সংগঠিত করে মিটিং মিছিল করতেন।  ১৯৭১ সালে ২৫শে মার্চের গণহত্যার পর ২৬শে মার্চ পালং থানায় ‘সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ” গঠন করা হয় এবং রথীন্দ্রকান্ত ঘটক চৌধুরী সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালের ৩১শে মার্চ পালং তুলাসার সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ে রথীন্দ্রনাথের নেতৃত্বে দশ-বারো হাজার লোক সমগম হয় এবং পাকিস্তান বিরোধী শ্লোগান দেয়। সে সময় এ অঞ্চলে প্রথম জাতীয় পাতাকা উত্তোলন করা হয়। আর এ জাতীয় পাতাকা উত্তোলন করেন সমাবেশের সভাপতি রথীন্দ্রকান্ত ঘটক চৌধুরী।

সাহিত্যিক জীবন

রাজনৈতিক, সামাজিকসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তার অসামান্য অবদান থাকলেও তার আসল পরিচয় হল তিনি ছিলেন একজন সাহিত্যিক। রথীন্দ্রকান্ত ঘটক চৌধুরীর সাহিত্য চর্চা শুরু করেন স্কুল জীবন থেকেই। বাংলা ১৩৪০ সালের ৩০শে পৌষ মাত্র বারো বছর বয়সে তিনি তার ঢাকার বাড়ির ছাদে  লুকিয়ে ‘প্রার্থনা’ নামে একটি কবিতা লেখেন।  এটি ছিল তার প্রথম সাহিত্য রচনা । কবিটি নিম্নরূপ-

জানিনা আমি               তোমার মহিমা

জানিনা তোমার কোথায় শেষ।

সলিলে, সাগরে           স্থলেই তো তুমি

আবার কোথায় সরগে বাস।

কেন আস তুমি           কেন যাও আর

সর্বদা থাকিবে ভুবন মাঝার,

….কভু না যাইবে আর।

কেন থাক তুমি         গুহার মাঝারে,

হইয়ে পক্ক কেশ

জানিনা তোমার কোথায় শেষ।

১৯৩৯ সালের এপ্রিল মাসে(বাংলা ১৩৪৫ সালের ২৫ থেকে ২৭ চৈত্র) কুমিল্লায় অনুষ্ঠিত ‘কুমিল্লা সাহিত্য সম্মেলন’ এ তিনি যোগদান করেন দক্ষিন বিক্রমপুরের ছাত্র প্রতিনিধি হিসেবে। সেখানে তার সাথে পরিচয় হয় খ্যাতনামা কবি যতীন্দ্রপ্রসাদ ভট্টাচার্য, পড়োখযাট সাহিত্যিক বিভূতিভূষন মুখোপাধ্যায়, সম্মেলনের সভাপতি সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, কাজি আবদুল ওদুদসহ অনেক নামকরা কবি সাহিত্যিকের সাথে।

১৯৪৮ সালের দিকে রথীদ্রকান্ত কয়েকজন বন্ধু মিলে তার প্রথম কাব্যগ্রন্থের নাম রাখেন ‘পদক্ষেপ’ এবং সেটি তখন কলকাতায় প্রকাশের আয়োজন করা হয়। এর আগে তিনি এ বইয়ের নাম রেখেছিলেন ‘আগুনবোনা’।  কিন্তু দুঃখের বিষয় হল সে বইটি প্রকাশ করা হয় বিশ বছর পর ১৯৬৮ সালে পারিবারিক প্রচেষ্টায়। তবে তখন এ বইয়ের নাম ‘আগুনবোনা’ বা ‘পদক্ষেপ’ কিছুই রাখা হয়নি, বিইটির নাম রাখা হয়েছিল ‘পূর্বাপর’।  এ বইয়ের ১ম সংস্করণ এখন আর পাওয়া যায় না। তবে ১৯৮৮ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে ‘মুক্তাধারা’ থেকে এটির দ্বিতীয় সংস্করণ বের হয়। সপ্তম শ্রেণী থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত অসংখ্য কবিতা লিখলেও ‘ পূর্বাপর’ ই হল একমাত্র কাব্যগ্রন্থ।

রথীন্দ্রকান্ত ঘটক চৌধুরী এক সময় ‘অগ্রনী’, ‘অরণী’ ইত্যাদি পত্রিকায় চাকরী ও সম্পাদনার কাজে সহায়তা করতেন । তিনি  ১৯৪৯ সালে ‘অভিধার’ নামে একটি মাসিক পত্রিকার ‘শারদীয়’ সংখ্যার সম্পাদনা করেন। মানিক বন্ধোপাধ্যায়ের ‘নেতা’ গল্পটি রথীন্দ্রকান্তের সম্পাদিত ‘অভিধারা’ পত্রিকার বিশেষ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল। ১৯৪৫ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত ফ্যাসীবিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘের অধিবেশনে তিনি ফরিদপুরের প্রতিনিধি হিসেবে যোগদান করেন। সেখানে তার সাথে পরিচয় হয়েছিল মানিক বন্দোপাধ্যায়ের সাথে। পত্রিকায় প্রকাশিত তার প্রথম দুটি রচনা হল ‘বালুচরা সিদ্ধেশ্বরী কালীবারি’(প্রবন্ধ), ‘বাসনা’(কবিতা)। তার এ প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয় ১৯৩৬ সালের ফেব্রুয়ারী-মার্চের ‘জ্ঞানলোক’ পত্রিকায়। তিনি মৃত্যুর আগে ‘সোনার বাংলা গান বিতর্ক’ নামে একটি রচনা লিখেছিলেন যা প্রকাশিত হয়েছিলো তার মৃত্যুর পর ১৯৮৮ সালে সংবাদ পত্রিকার সাহিত্য পাতায়। তিনি ছাত্র অবস্থায় রসবল্লভ ছন্দনামে ‘ভল্টো হাওয়া’ নামক একটি প্রহসন রচনা করেছিলেন। সেটি রচনা ও অভিনয় করেছিলেন শান্তিনিকেতনে।

চাকরী জীবন

রথীন্দ্রকান্ত চৌধুরীর চাকরী জীবন শুরু হয় ১৯৪৫ সালে চকন্দী হাই স্কুলে শিক্ষক হিসেবে। সেখানে তিনি চাকরি করেন ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত। এরপর তিনি ্যোগদান করেন কলকাতা থেকে প্রকাশিত স্বর্ণকমল ভট্টাচার্যের অগ্রণী পত্রিকায়। অগ্রণী পত্রিকার পর যোগদান করেন অরণী পত্রিকায়। ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত অবস্থান করেন কলকাতায়। ১৯৫০ সালে বালুচরে ফিরে এসে যোগ দেন পালং হাই স্কুলের অস্থায়ী শিক্ষক হিসেবে। পরবর্তীতে তিনি সেখানে স্থায়ীভাবে যোগ দেন।

১৯৫৪ সালে পালং হাই স্কুলন ছেড়ে যোগ দেন তুলাসার গুরু দাশ উচ্চ বিদ্যালয়ে। সেখানে তিনি চাকরি করেন ১৯৬০ সাল পর্যন্ত।

ঢাকা বেতার কেন্দ্রের লোকগীতি অনষ্ঠানের প্রবর্তন

রথীন্দ্রকান্তঘটক চৌধুরী ছিলে ঢাকা বেতার কেন্দ্রের লোকগীতি উৎসব’ অনুষ্ঠানের প্রস্তাবক। ১৯৫৬ সালে তিনি বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সিরাজুদ্দিন সরদার কে নিয়ে ঢাকা বেতার কেন্দ্রে যান। সেখানে তার বন্ধু ঢাকা বেতার কেন্দ্রের সহকারী পরিচালক শামসুল হুদা চৌধুরীকে গ্রামের আনাচে-কানাচের প্রতিভাবান শিল্পীদের নিয়ে লোকগীতি উৎসব চালুর প্রস্তাব দেন। তার প্রস্তাব ও উদ্যোগের উপর ভিত্তি করে ১৯৫৭ সালের ২১শে মার্চ রাত ৯টা থেকে ঢাকা বেতার কেন্দ্রে ১ম লোকগীতি অনুষ্ঠান শুরু হয়। শামসুলহক চৌধুরীর পরিকল্পনায় তিনি তরজা বিচারের ভূমিকা পালন করেন। সে অনুষ্ঠানের প্রধান প্রধান শিল্পিদের মধ্যে ছিলেন মুর্শিদী গায়ক আবদুল হালিম বয়াতি, হাজেরা বিবি, পুথি গায়ক শাকিম আলী বয়াতি সহ অনেক নামকরা কবি ও গায়ক। এ লোকগীতি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে গ্রামের আনাচে-কানাচের শিল্পীরা এক সময় বড় শিল্পী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। আর এরপর থেকেই গায়ক গায়িকাদের রেডিওতে গান গাওয়ার প্রচলন শুরু হয়।

শরীয়তপুর জেলা প্রতিষ্ঠা ও কিছু উদ্যোগ

শরীয়তপুর মহাকুমা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭৭ সালের ১লা নভেম্বর। রথীন্দ্রকান্তঘটক চৌধুরী মহকুমা স্থাপনে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। মহকুমা হিসেবে সদরের স্থান নির্বাচনও ছিল তার অবদান। ১৯৭৮ সালে তার উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় শরীয়তপুর শিল্পকলা একাডেমী। তিনি প্রতিষ্ঠাকালে ছিলেন এর সম্পাদক এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ছিলেন সহসভাপতি। শরীয়তপুর কলেজ ও শরীয়তপুর বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ও সরকারি করনে তার অবদান ছিল। ১৯৮২ সালের ১৬ জুলাই রথীন্দ্রকান্তের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় শরীয়তপুর পাবলিক লাইব্রেরী। ১৯৮২ সালের ২৩শে জানুয়ারী পাবলিক লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠা কারার জন্য রথীন্দ্রকান্তঘটক চৌধুরীকে আহবায়ক করে একটি কমিটি গঠন করা হয়। প্রতিষ্ঠাকেলে তিনি ছিলেন এর সম্পাদক এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।

শরীয়তপুরকে মহকুমা থেকে জেলা প্রতিষ্ঠায় তিনি মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। ১৯৮৩ সালে শরীয়তপুর মহকুমা বাতিল করে উপজেল গঠন করলে জেলা বাস্তবায়ন কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়। শরীয়তপুর পাবলিক লাইব্রেরীতে রথীন্দ্রনাথের সভাপতিত্বে সভা অনুষ্ঠিত হয় এবং রথীন্দ্রকান্ত ঘটক চৌধুরীকে সভাপতি করে ‘শরীয়তপুর জেলা বাস্তবায়ন কমিটি’ গঠন করা হয়। রথীন্দ্রনাথের নেতৃত্বে শরীয়তপুরের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সভা-সমাবেশ করেন। অবশেষে তাদের সফল প্রচেষ্টায় ১৯৮৪ সালের ১লা মার্চ বাংলাদেশ সরকার শরীয়তপুরকে জেলা হিসেবে উন্নীত করে।

১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর অনেকে দেশ ছেড়ে ভারত চলে যায়। ছাত্র সংকটের কারনে ১৯৫৬ সালে পালং ও তুলাসার স্কুল দুটিকে একত্রিত করা হয়। তিনি তখন ছিলেন তুলাসার গুরুদাশ হাই স্কুলের শিক্ষক। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীনের পর রথীন্দ্রনাথের উদ্যোগে পালং উচ্চ বিদ্যালয়কে আবার তার পূর্বের জায়গায় ফিরিয়ে নেয়া হয় এবং এটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ বিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়।

মৃত্যু

অবশেষে ১৯৮৪ সালের ১৫ই জুন  তিনি দুনিয়া থেকে চিরবিদায় নেন। মৃত্যুর সময় তার বয়স হয়েছিল ৬৭ বছর। মৃত্যুকালে তিনি রেখে গেছেন স্ত্রী কন্ঠশিল্পী রানীঘটক চৌধুরী ও নয় পুত্র ও কন্যা(শিখা, শীলা, অনীক, হাসি,খুশী, পূর্ণিমা, অভীক, অমিত ও মালা)।মৃত্যুর পর তার স্মৃতিস্বরূপ ১৯৮৪ সালের ১২ জুলাই প্রতিষ্ঠা করা হয় ‘রথীন্দ্র সাহিত্য পরিষদ’। এ পরিষদের সভাপতি ছিলেন সাহিত্যিক আবু ইসাহাক।

লেখক

এম এম রেদোয়ান আহমেদ মাসুদ রানা

ব্রাক বিশ্ববিদ্যালয়।

মহারাজা রাজবল্লভ সেন

মহারাজা রাজবল্লভ সেন   (১৭০৭-১৭৬৩)

 

মহারাজা রাজবল্লভ ছিলেন ইতিহাসের বহুল আলোচিত,  বিতর্কিত ও অত্যান্ত ক্ষমতাধর জমিদার। তিনি ১৭০৭ সালে বর্তমান শরীয়তপুর জেলার নড়িয়া থানার রাজনগরে জন্ম গ্রহন করেন।  তার পিতার নাম ছিল কৃষ্ণজীবন মজুমদার। তার মাতা ছিলেন বাকলার(বরিশাল) উত্তর শাহবাজপুর(বর্তমান ভোলা) পরগনার জমিদার কন্যা।  রাজ বল্লভের বাবা তত সম্পদশালী ছিলেন না। তিনি কানুনগুইর সেরেস্তার মুহুরী ছিলেন। রাজবল্লভ ছিলেন সুদর্শন। তিনি যেখানে যেতেন সেখানেই সবার মন জয় করতে পারতেন। আর এজন্যে  প্রচুর সম্পত্তি অর্জন তার তেমন কোন সমস্যা হয়নি। রাজবল্লভ ছিলেন বৈদ্য বংশীয়। তার ছিল তিন স্ত্রী। প্রথম স্ত্রীর ছিল সাত পুত্র ( রামদাশ, কৃষ্ণদাশ, গঙ্গাদাশ, রতন দাশ, গোপাল দাশ, রাধামোহন ও কেবল রাম)।

তার সাত পুত্রের মধ্যে জৈষ্ঠপুত্র রামদাশ খুব বিচক্ষণ  ছিলেন   ।  তিনি ছিলেন ঢাকা নায়েবের সহকারী। তবে তিনি মানুষের উপর  অত্যাচার করতেন বলে  অনেকের কাছে অপ্রিয় হয়েছিলেন    । তার তৃতীয় পুত্র গঙ্গাদাশ রাজোপাধি লাভ করেছিলেন।  আরেক পুত্র গোপাল কৃষ্ণ বরিশালের বিখ্যাত ‘নলছিটি’ বন্দর নির্মাণ করেছিলেন।  নল ও ছিটকি পরিষ্কার করে এ বন্দর নির্মাণ করেন বলে এর নামকরণ হয় ‘নলছিটি’ বন্দর। সেখনে তিনি বন্দর ছাড়াও বেশ  কিছুমন্দির নির্মাণ করেন।

রাজা রাজবল্লভ সেন প্রথমে মুর্শিদাবাদের প্রসিদ্ধ জমিদার জগৎশেঠের  কার্যালয়ের একজন সাধারণ মুহুরী ছিলেন। এ সময় তিনি জগৎশেঠের খুব কাছের মানুষে পরিণত হন। জগৎশেঠ তার প্রতি খুশি হয়ে তাকে শিক্ষিত করার জন্য একজন মুন্সি নিয়োগ দেন।  তিনি অল্প দিনের মধ্যেই পারসি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন। ১৭২৯ সালের দিকে তিনি ঢাকা জেলার গভর্নর মুরাদ আলীর পেশকার নিযুক্ত হন। এরপর তিনি ঢাকার নায়েব নাজিম নওয়াজিশ খানের নৌ বাহিনীর পেশকার হন। ১৭৫৬/১৭৫৭ সালে তিনি ঢাকার দেওয়ান হন এবং তার উপাধি হয় ‘দেওয়ান’ । এরপর তিনি মুঙ্গের ফৌজদার পদমর্যাদায় অধিষ্ঠিত হন।

আঠারো শতকের মাঝামাঝি সময়ে বরিশালের জমিদার আগা বাকের ও নওয়াজিশ খানের মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে ১৭৫৩ সালে নবাব সিরাজুদ্দৌলার নির্দেশে আগা বাকেরের পুত্র আগা সাদেক নওয়াজিশ খানের পক্ষের লোক হোসেন আলীকে হত্যা করেন। এর প্রতিশোধ হিসেবে বাংলা ১১৬০ সালে রাজা রাজবল্লভ তার পুত্র রামদাশ ও কৃষ্ণদাস এবং নওয়াজিশ খানের সেনাবাহিনী নিয়ে আগা বাকের ও আগা সাদেকের উপর আক্রমন করেন। আগা সাদেক পালিয়ে গেলেও আগা বাকের এ যুদ্ধে নিহত হন। আগা সাদেকের আত্নগোপনের সুবাদে রাজা রাজবল্লভ মীর জাফরের সম্মতিতে তার সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেন এবং তিনি এ সম্পত্তি অধিগ্রহণ করেন। বাংলা ১১৬৪ সালে আগা সাদেক ফিরে আসেন এবং তার পুত্র আগা সালের(মোহম্মদ সালের) জন্য পরগনার ওয়াদাদারি লাভ করেন, আর তিনি নিজেই নিজের জমিদারি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। বাংলা ১১৬৬ সালে আগা সাদেক মারা গেলে রাজা রাজবল্লভ ১১৬৭ সালে আগা সাদেকের সম্পত্তি আবার দখল করে নেন। আর এরপর থেকেই রাজা রাজবল্লভ আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে যান এবং তার শক্তি সামর্থ্য আরও বেড়ে যায়,শুরু করে দেন ভয়াবহ জোর-জুলুম।

একজন উচ্চাকাঙ্ক্ষী মানুষ হিসেবে রাজা রাজবল্লভ তার অফিসিয়াল পদ ব্যবহার করতেন সম্পত্তি ও ভূমি অর্জনে।  ফরিদপুর, বরিশাল ও তিপারার ভূমি অর্জন করে তিনি তার নিজ নামে রাজনগর নামে নতুন একটি পরগণা গঠন করেন। পরবর্তীতে তিনি তার পরগনায় বিক্রমপুরকে যোগ করে রাজনগর পরগনাকে আরো সম্প্রসারিত করেন।   রাজবল্লভ ঢাকা, ফরিদপুর ও বরিশালের  তালুকদারীর উপর কর্তৃত্ব অর্জন করেন। আর এভাবেই তিনি হয়ে যান অসামান্য ক্ষমতার অধিকারী একজন বিশাল জমিদার  ।

১৭৫৬ থেকে ১৭৬৩ সাল পর্যন্ত যখন বাংলার রাজনৈতিক অবস্থা যখন টালমাটাল, তখন তিনি , মীর জাফর ও ঘসেটি বেগম বাংলার রাজনীতিতে বিতর্কিত ভূমিকা পালন করেন।  ঢাকার দেওয়ান থাকাকালীন সময়ে তিনি জমি থেকে প্রাপ্ত খাজনা তার পুত্রকে দিয়ে সিরাজউদ্দোউলার কাছে পাঠিয়েছিলেন । তার পুত্র সে টাকা  নিয়ে  পালিয়ে গিয়ে কলকাতায় ইংরেজদের কাছে আশ্রয় নেন। এ কারনে সিরাজউদ্দোউলার সাথে ইংরেজদের বিরোধ দেখা দেয় এবং পলাশীর যুদ্ধে সিরাজউদ্দোউলার পরাজয়ের  অন্যতম কারন ছিলেন রাজা রাজবল্লভ সেন।

রাজা রাজবল্লভ যখন ‘রাজনগর’ পরগনা সৃষ্টি করেন, তখন সেখানে উল্লেখ করার মত তেমন কিছু ছিল না। তিনি সেটিকে পরিণত করেন একটি শহরে। নির্মাণ করেন বিভিন্ন রকমের সুউঁচ্চ দালানকোঠা, মন্দির, নবরত্ন ইত্যাদি।  মহারাজ রাজবল্লভের সেসব কীর্তিনিকেতনগুলো হলো রাজনগরের নবরত্ন, সপ্তরত্ন, একবিংশ রত্ন( একুশ রত্ন) ইত্যাদি। এসব গগনচুম্বী সৌধাবলি সৌন্দর্যে ও স্থাপত্য কৌশলে তৎকালে বঙ্গদেশে শীর্ষস্থানীয় ছিল। এছাড়া তিনি হলদিয়ায় নির্মাণ করেন এক বিশাল পাষাণময়ী কালী, যা ছিল ইতিহাসখ্যাত এবং দেবীর জন্য নির্মাণ করেন একটি মন্দির।

তৎকালে রাজনগরে নির্মিত বিশাল স্থাপনাগুলো পর্যটকদের কাছে খুবই প্রিয় ছিল। সে সময় দেশ-বিদেশ থেকে বহু লোক তার এসব কীর্তি দেখার জন্য রাজনগরে আসতেন। এসব কীর্তিগুলো এতোই সৌন্দর্যমণ্ডিত ছিল যে সবাই তা দেখে অবাক হয়ে যেত। তিনি সেখানে একটি দোলমঞ্চ  নির্মাণ করেন যার নাম ছিল সপ্তদশ রত্ন।এই সপ্ততশ রত্নটি এতই উঁচু ও বড় ছিল যে একটি রত্নের উপর থেকে অপর রত্নের একজন লোককে একটি ক্ষুদ্র বিড়ালের চেয়ে ছোট  মনে হতো এবং সুবিশাল পদ্মাকেও  অতি খুদ্র দেখাত। দোলমঞ্চের একদিক থেকে অন্য দিকে যেতে স্থানে স্থানে দুই – তিন বার বিশ্রাম নিতে হত। রাজা রাজবল্লভ প্রতি বছর এই দোলমঞ্চে মহাসমারোেহ উৎসব করতেন। দোলমঞ্চ  অপেক্ষা একুশ রত্ন আর উচু ছিল। তবে তুলনামূলকভাবে দোলমঞ্চকে দেখতে একুশ রত্ন অপেক্ষা বেশি সুন্দর মনে হত।

তালতলা বন্দরের বিপরীত দিকে পঞ্চরত্ন –মন্দিরের অভ্যন্তরে মহারাজ রাজবল্লভ শিবলিঙ্গ ও ‘’আনন্দময়ী’’ নামক একটি কালিকা মূর্তি নির্মাণ করেন। ধারনা  করা হয় ঐ মন্দিরটি তিনি সন্ধ্যা-বন্দনার জন্য নির্মাণ করেছিলেন।

সুউঁচ্চ স্থাপনা ছাড়াও তিনি রাজনগরে অনেকগুলো বিশালাকৃতি  দিঘী খনন করেন। একেকটা দিঘী এতই সুপ্রশস্ত ছিল যে এর এক পাড় থেকে বন্দুকের গুলির শব্দ অন্যপাড়ে শোনা যেত না। প্রতিটি দিঘীর ভিন্ন ভিন্ন নাম ছিল। এসব  দিঘীর নামকরণ করা হয়েছিলো  এগুলোর  ব্যবহার অনুসারে। রাজা-রানী ও তার সহচররা এক একজন এক একটি দিঘীতে স্নান করতেন। রাজা রাজবল্লভ যে দিঘীতে স্নান করতেন সেটির নাম ছিল(তার নাম অনুসারে) ‘রাজসাগর’। রানীরা যে দিঘীতে স্নান করতেন সেটির নাম ছিল ‘রানীসাগর’। ধাত্রীদিগেরা যে দিঘিতে স্নান করতেন সে দিঘীর নাম ছিল ‘ধাইসাগর’ এবং যে জলাশয়ে শুক পাখিকে স্নান করাতেন তার নাম ছিল ‘শুকসাগর’। এগুলো ছাড়াও তিনি সেখানে বিভিন্ন নামে আরও কতগুলো দিঘী খনন করেছিলেন।

রাজবল্লভ সেন যেসব  কীর্তি তৈরি করেছিলেন তার সবকিছুই এক সময় ‘কীর্তিনাশা’ নদীতে বিলীন হয়ে  যায়। ব্রিটিশ ভূ-জরিপবিদ মিঃ বেনেল ১৭৮০ সালে পূর্ববঙ্গের যে মানচিত্র প্রণয়ন করেছিলেন সেখানে কীর্তিনাশা নামে কোন নদীর অস্তিত্ব ছিল না। বিক্রমপুরের অন্তর্গত রাজনগর ও ভবেশ্বর গ্রামের মধ্যে একটি অপ্রশস্ত  জল প্রণালী বিদ্যমান ছিল।  যা ছিল  প্রাচীন কালীগঙ্গার শেষ চিহ্ন। ১৮১৮ সাল থেকে এটি ধীর ধীরে প্রবাহিত হতে থাকে।  ১৮৪০ সাল পর্যন্ত এটি বিক্রমপুরের পূর্ব দিক দিয়ে প্রবাহিত হতো । ১৮৫৮ সাল থেকে ১৮৬০ সাল পর্যন্ত রাজনগর থেকে মুলফৎগন্ত পর্যন্ত একটি নতুন নদীর সৃষ্টি হয়, যাহা পরবর্তীতে মেঘনার সাথে মিলিত হয়। ১৮৬৯ সালে কীর্তিনাশা রাজনগরের পূর্ব দিকে নতুন পথে  প্রবাহিত হয়। ১৮৭০ সালের দিকে কীর্তিনাশা আরও বেগবান হয়ে রাজা রাজবল্লভের সমস্ত কীর্তি গ্রাস করে ফেলে। ১৮৮৬ সালে লরিকুল ও ঝপসা দেবমন্দির এ নদী গর্ভে বিলীন হয়। আর এভাবে রাজা রাজবল্লভের সমস্ত কীর্তি ধবংসের জন্য মানুষের মুখে মুখে এ নদীর নাম হয়ে যায় কীর্তিনাশা। এ কীর্তিনাশাই বিক্রমপুরকে উত্তর ও দক্ষিন দুই ভাগে বিভক্ত করে ফেলে।

১৭৬৩ সালে মীর কাশিম বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার নবাব নিযুক্ত  হলে রাজা রাজবল্লভ ও তার সহযোগীরা ইংরেজদের উৎখাতের চেষ্টায় লিপ্ত হন। এই ষড়যন্ত্রের বিচার স্বরূপ মীর কাশিম ১৭৬৩ সালে রাজা রাজবল্লভ, তার পুত্র কৃষ্ণদাশ, স্বরূপ চাঁদ, রাম নারায়ন ও মাতাব চাদকে মুঙ্গের দুর্গের চূড়া থেকে পদ্মা নদীতে নিক্ষেপ করে মৃত্যুদন্ড দেন। যেভাবে তার মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়েছিলো তা ছিল খুবই  দুঃখজনক। আর এভাবেই মহারাজা রাজবল্লভ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে।

লেখকঃ

এম এম রেদোয়ান আহমেদ মাসুদ রানা

ব্রাক বিশ্ববিদ্যালয়।

গোপাল চন্দ্র ভট্রাচার্য্য

গোপাল চন্দ্র ভট্রাচার্য্য (১৮৯৫-১৯৮১)

বিখ্যাত প্রকৃতি বিজ্ঞানী গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য ১৮৯৫ সালের ১লা অগাস্ট শরীয়তপুর জেলার নড়িয়া উপজেলার লনসিং গ্রামে (তৎকালীন লনসিং থানা) জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত  দরিদ্র পরিবারের সন্তান। তাঁর বাবার নাম অম্বিকাচরণ ও মায়ের নাম শশীমুখী। তাঁর বাবার পেশা ছিল যমজানি ও মা ছিল গৃহিণী। অম্বিকাচরণ ও শশীমুখীর ছিল চার সন্তান। গোপালচন্দ্রের পাঁচ বছর বয়সেই  তাঁর বাবা অম্বিকাচরণ মারা যান। স্বামী অম্বিকাচরণের মৃতুতে শশীমুখী সন্তানদের নিয়ে বড় বিপাকে পড়েন । এ পরিস্থিতিতে মা তাদের অভাবের সংসারে চারটি সন্তান খুব কষ্টে লালন-পালন করেছিলেন।

সংসারের দুরাবস্থার মধ্যেই গোপালচন্দ্রকে তাঁর মা ভর্তি করে দেন গ্রামের  পাঠশালায়। পারিবারের বড় সন্তান হওয়ায় তাকে পড়াশুনার পাশাপাশি  সংসারের নানা ধরনের কাজ করতে হতো। গ্রামের পাঠশালায় পড়া শেষে গোপালচন্দ্র ভর্তি হন লোনসিং স্কুলে। ১৯১৩ সালে গোপালচন্দ্র এই স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষায়  ফরিদপুরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নম্বর পেয়ে প্রথম স্থান অধিকার করেন ।  এরপর গোপালচন্দ্র ভর্তি হন ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজে। কিন্তু দুঃখ তাঁর   পিছু ছাড়ল না। যে ব্যক্তি তাঁর লেখা-পড়ার ভার গ্রহণ করছিলেন দ্ব্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে তিনি তা বন্ধ করে দেন। প্রচণ্ড অর্থ সংকটে পড়ে তিনি পড়া-লেখা ছেড়ে গ্রামের বাড়ি লোনসিং এ চলে আসেন । আর এখানেই গোপালচন্দ্রের  ছাত্র জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে।এরপর ১৯১৫ সালে গোপালচন্দ্র লোনসিং স্কুলে ভুগলের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন।
পৃথিবীতে অনেক বিজ্ঞানি অনেক বিষয় নিয়ে গবেষনা করেছেন। কিন্তু গোপালচন্দ্রের গবেষনার বিষয় ছিল একটু ভিন্ন রকমের। তিনি যে বিষয় নিয়ে গবেষণা করেছেন, তাতে  মানুষ তাকে প্রথমে পাগল ছাড়া অন্য কিছু ভাবত না। একজন শিক্ষক, যিনি শুধু ব্যস্ত থাকবেন তার ছাত্র-ছাত্রীদের পড়ালেখা নিয়ে, সামাজিক কর্মকাণ্ড নিয়ে অথবা অন্য কোন গবেষণা নিয়ে। কিন্তু তিনি হঠাৎ করে পোকা-মাকড় ধরে নিয়ে আসতেন, পরীক্ষা নিরীক্ষা  করতেন আবার ছেড়ে দিতেন। আবার রাতের বেলায় অন্ধকারে চলে যেতেন ভূতের আগুন (আলেয়া) ধরানোর দৃশ্য দেখতে।
ছেলেবেলা থেকেই গোপালচন্দ্রের ছিল লতা-পাতা, পোকা-মাকড় ইত্যাদি বিভিন্ন জীবের প্রতি প্রবল আগ্রহ। এজন্য তিনি বারবার চলে যেতেন ঝোপ-ঝাড়, খাল-বিল, নদী-নালায় কীটপতঙ্গের খোঁজে , সেখানে তিনি প্রত্যক্ষ করতেন কীটপতঙ্গের আচার-আচরণ ও গতিবিধি। তিনি যখন লোনসিং স্কুলের শিক্ষক ছিলেন তখন সেখানে ছিলেন অন্য যোগেন নামে আরেকজন শিক্ষক যিনি খুব ভাল ম্যাজিক দেখাতে পারতেন। এ সম্পর্কে গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য তার একটি বইতে লিখেছেন… “মাঝে মাঝে যোগেন মাস্টার ছেলেদের ডেকে এনে ম্যাজিকের খেলা দেখাতেন। একটা মজার জিনিস দেখাবেন বলে একদিন তিনি সবাইকে ডেকে নিয়ে এলেন। পকেট থেকে গাঢ় খয়েরি রঙের কতগুলি বিচি বের করে টেবিলের ওপরে রাখার পরেই একটি বিচি প্রায় চার ইঞ্চি উঁচুতে লাফিয়ে উঠল। তারপর এদিক-ওদিক থেকে প্রায় সবগুলি থেকে থেকে লাফাতে শুরু করে দিল।…অবশেষ মাস্টার মশাই ছুরি দিয়ে একটা বিচি চিরে ফেলতেই দেখা গেল তার ভেতরে একটা পোকা (লারভা)”। গ্রামের এই অভিজ্ঞতা থেকে গোপাল চন্দ্রের পোকা মাকড়ের প্রতি আরও বেশি আগ্রহ জন্মে। স্কুলে শিক্ষকতা করার সময় তিনি জারি গান ও পালা গান লিখতেন। তিনি লনসিং থেকে একটি  ম্যাগাজিন ও প্রকাশ করেছিলেন। যেখানে তিনি লিখেছেলেন নানা বিষয়ে তাঁর নানান অভিজ্ঞতার কথা।

অর্থ সংকটের কারনে গোপালচন্দ্র চলে গেলেন কলকাতায়। সেখানে তিনি চাকরি নেন কাশিপুরে অবস্থিত বেঙ্গল চেম্বার অব কমার্সে। সেখানে একদিন গোপালচন্দ্রের সাথে দেখা হয়  বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসুর সাথে। তখন থেকে তাঁর গবেষণার প্রতি আগ্রহ আরও বেড়ে যায়। ১৯২০ সালে তিনি প্রকাশ করেন পঁচা গাছপালার আশ্চর্য আলো বিকিরনের ক্ষমতা”। যেটি প্রকাশ হয় বঙ্গবাসী পত্রিকায়। সেখানে তিনি উল্লেখ করেছেন রাতের আঁধারে ‘আলেয়া’ নামক যে আগুন জ্বলতে দেখা যায় তার কথা। গ্রামের মানুষ একে বলে “ভূতের আগুন” অর্থাৎ অন্ধকার রাতে ভুত আগুন জ্বালিয়ে ও নিভিয়ে খেলা করে।  তিনি লিখেছেন লোনসিং স্কুলে শিক্ষকতা কারার সময় একদিন তিনি ভূতের আলো দেখার জন্য দুই বন্ধু মিলে রাতের আঁধারে গিয়েছিলেন ‘পাঁচীর মার ভিটা’ নামক একটি স্থানে। আগুনের (ভূতের আগুন) একবারে কাছে গিয়ে দেখেন আসলে সেটা কোন ভূতের আগুন নয়, গাছের গুড়ি থেকে এক ধরনের গ্যাস বের হচ্ছে যাকে বলা হয় ‘আলেয়া’। এ থেকে তিনি প্রমাণ করেন রাতের  আঁধারে জংগলের মধ্যে অথবা দূরে ক্ষেতের ধারে যে আলো দেখা যায় তা ভূতের আলো নয়, এগুলো মিথেন গ্যাসের আলো যা গাছের  পঁচা জৈব পদার্থ থেকে সৃষ্টি হয়। গোপালচন্দ্রের এই লেখা একদিন বিজ্ঞানী জগদীশ্চন্দ্র বসুর দৃষ্টিগোচর হয়। তিনি তার লেখা পড়ে খুবই মুগ্ধ হন। এরপর তিনি গোপালচন্দ্রকে নিয়ে আসার জন্য শরীয়তপুরের আরেক কৃতী সন্তান প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ পুলিনবিহারী দাসকে অনুরোধ করেন। জগদীশ্চন্দ্রের অনুরোধে পুলিনবিহারী দাস গোপালচন্দ্রকে নিয়ে যান জগদীশ্চন্দ্রের অফিসে। সেখানে জগদীশ্চন্দ্র গোপালচন্দ্রকে তাঁর প্রতিষ্ঠানে যোগ দেওয়ার জন্য বলেন। ১৯২১ সালে গোপালচন্দ্র যোগ দেন জগদীশ্চন্দ্রের নব প্রতিষ্ঠিত বসু বিজ্ঞান মন্দিরে। সেখানে তিনি কাজের  ফাঁকে ফাঁকে কীটপতঙ্গ, পোকামাকড় ও গাছপালা নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যান।

গোপালচন্দ্র যখন বসু বিজ্ঞান মন্দিরে কর্মরত,তখন(১৯২১) সেখানে এসেছিলেন জার্মান প্রকৃতি বিজ্ঞানী হ্যানস মলিশ। গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য তাঁর সহকারী হিসেবে ছয় মাস কাজ করেন। তিনি হ্যানস মলিশের সাথে কীটপতঙ্গের আচার-আচরণ, গতি-প্রকৃতি, খাদ্য সংগ্রহের কৌশল, তাদের বংশবিস্তার ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয় সমন্ধে গবেষণা করেন। যার ফলে কীটপতঙ্গ ও লতাপাতা বিষয়ে তার অভিজ্ঞতা আরও বৃদ্ধি পায়। গোপালচন্দ্র গবেষণা করেছেন বিভিন্ন ধরনের পোকা মাকড় নিয়ে। তার মধ্যে ছিল… ব্যাঙ্গাচি, শুইপোকা, মাছখোকো মাকড়সা, বোলতা ইত্যাদি পোকা মাকড়ের জীবন ও বৈচিত্র। স্ত্রী ও পুরুষ ্মাকড়সার আচার আচরণ ও গতিবিধি, তাদের শক্তি ও অবস্থান, ডিম দেয়া ও এর যত্ন, স্ত্রী মাকড়সার প্রতি পুরুষ মাকড়সার আচরণ, স্ত্রী মাকড়সা কর্তৃক পুরুষ মাকড়সার গলাধঃকরণ। শুয়োপোকা, প্রজাপতি, পিঁপড়ে ইত্যাদির জীবন রহস্য । এছাড়াও তিনি কীটপতঙ্গ সমন্ধে বিভিন্ন ধরনের গবেষণা করে গেছেন। ১৯৩১ সাল থেকে ১৯৪১ সাল পর্যন্ত তিনি কীটপতঙ্গ ও লাতাপাতা বিষয়ে ১৬ টি গবেষণামূলক প্রবন্ধ লিখেন। সুবিখ্যাত ‘ভারত কোষ’ সম্পাদনায় ও গোপালচন্দ্রের ছিল অসামান্য অবদান।

১৯৪৯ সালে গোপালচন্দ্র যোগ দেন বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্র নাথ বসুর প্রতিষ্ঠিত বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদে , সম্পাদক হন মুখপাত্র জ্ঞান- বিজ্ঞান পত্রিকার। সেই পত্রিকায় তিনি শিশুবিষয়ক ৮০০ নিবন্ধ প্রকাশ করেন। গাছ-উকুনের রস ও মুকুলের মধুতে থাকা ভিটামিন ‘বি’ এর প্রভাবে পিপড়ের শ্রেনী বিন্যাস হয়। তিনি গবেষণা করে প্রমান করেছেন খাদ্যবস্তুর প্রভাবে পিঁপড়ের বাচ্চারা ডিম ফুটে কেউ হয় রাণী, কেউ হয় শ্রমিক আবার কেউ হয় পুরুষ। যারা ভিটামিন বেশি পায় তারা হয় রাণী, যারা কম পায় তারা হয় পুরুষ, আর যারা সবচেয়ে কম পায় তারা হয় শ্রমিক। তবে সবচেয়ে কম খাদ্য পওয়ার সংখ্যা ই সবচেয়ে বেশি হয়। এ বিষয়ে দুটি মতবাদ আছে। একটি হল জেনেটিক এবং আরেকটি হল ট্রাফিক। উক্ত মতবাদ দুটি গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য ৪০ বছর আগেই দিয়ে গেছেন। কিন্তু তাঁর এই মতবাদের কোন স্বীকৃতি আজও মেলেনি। যা রয়ে গেছে অন্তরালে। গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য এর গবেষণার কথার লিখে শেষ হবে না।তাঁর লেখা অনেকগুলো প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় আনন্দবাজার পত্রিকায়। তাঁর  লেখা    কিছু ইংরেজি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় সায়েন্স অ্যান্ড কালচার, ন্যাচারাল হিস্ট্রি সোসাইটির মুখপত্র, মডার্ন রিভিউ ইত্যাদি বিখ্যাত পত্রিকায়। তবে তাঁর সব প্রবন্ধগুলো যদি বিদেশী নামি দামী পত্রিকায় প্রকাশ করা যেত, তাহলে তিনি হতে পারতেন বিশ্বের নামকরা বিজ্ঞানীর একজন।

১৯৫১ সালে ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য কে আমন্ত্রণ জানানো হয়। তবে বিশ্বের নামকরা বিজ্ঞানীরা এতে বাঁধ  সাধেন। তারা গোপালচন্দ্রের মতো একজন কম শিক্ষিত লোকের সাথে সম্মেলন করতে অনীহা প্রকাশ করেন। এখানে একটি কথা হল- গোপালচন্দ্রকে যারা কম শিক্ষিত বলে আলোচনায় অনীহা জানিয়েছিলেন, প্রকৃত পক্ষে তারাই অশিক্ষিতের পরিচয় দিয়েছেলেন। কেননা, পৃথিবীতে বহু সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী, মনিষী রয়েছেন যাদের অনেকেই ছিল অশিক্ষিত ও সাধারণ অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন। এমনকি অনেকের অক্ষর জ্ঞান ছিলনা বললেই চলে। “করে দেখা”(kara dakha) নামক তিন খণ্ডে প্রকাশিত  একটি বই রচনা করে গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য অনেক সুনাম কুঁড়িয়েছিলেন। গোপালচন্দ্র  শুধু একজন বিজ্ঞানীই  ছিলেননা , তিনি ছিলেন  লেখক – গবেষক। তিনি ১০০০ টির মত বিজ্ঞান বিষয়ক আর্টিকেল রচনা করে গেছেন। যার স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি ১৯৬৮ সালে লাভ করেন ‘আনন্দ পুরুস্কার’(আনন্দ সাহিত্য পুরুস্কার) , ১৯৪৭ সালে পান আচার্য সতেন্দ্রনাথ বসু ফলক , ১৯৭৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর তাঁকে দেওয়া হয় জাতীয় সংবর্ধনা , ১৯৭৫ সালে ‘কীটপতঙ্গ’ গ্রন্থের জন্য তিনি লাভ করেন রবীন্দ্র পুরুস্কার। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৮১ সালের ২১ জানুয়ারী তাঁকে দেয়া হয় ডি এস সি উপাধি।

১৯৮১ সালের ৮ এপ্রিল গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
লেখক

এম এম রেদোয়ান আহমেদ মাসুদ রানা

ব্রাক বিশ্ববিদ্যালয়।

হুমায়ুন কবির

হুমায়ুন কবির (১৯০৬ ইং  -১৯৬৯ ইং )
প্রাথমিক পরিচয়

হুমায়ুন কবির  নামটি শুনলে হয়তোবা অনেকের প্রথমে মনে পড়বে “মেঘনায় ঢল” কবিতার কথা। বাংলার মানুষের কাছে যে নামটি আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। যে মানুষটি ছিলেন একাধারে কবি, সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ  ও  রাজনীতিবিদ। সব দিকেই তাঁর ছিল সমান দক্ষতা। সাহিত্য, শিক্ষা , রাজনীতি সকল ক্ষেত্রেই তিনি সাফল্যের স্বর্ণ শিখরে  পৌঁছেছিলেন । তিনি ছিলেন ভারতের শিক্ষা সচিব, ইউনিভার্সিটি গ্রন্থ কমিশন এর চেয়ারম্যান, বেসামরিক বিমান চলাচল প্রতিমন্ত্রী , বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও সংস্কৃতি মন্ত্রী, শিক্ষা মন্ত্রী ও  পেট্রলিয়াম মন্ত্রী ।

জন্ম ও বংশ পরিচয়

বিখ্যাত সাহিত্যিক  ও রাজনীতিবিদ  হুমায়ুন কবির ১৯০৬ সালের ২২ শে ফেব্রুয়ারি ফরিদপুর জেলার কোমরপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পুরোনাম হুমায়ুন জাহিরুদ্দীন আমীর – ই – কবির । তাঁর  বাবার নাম কবিরুদ্দিন আহমেদ ও মায়ের নাম বেগম মাজেদ খাতুন। কবিরুদ্দিন আহমেদ ছিলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট । ব্রিটিশ সরকার তাঁকে খান বাহাদুর উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন । হুমায়ুন কবির এর সকল ভাই ও  বোনেরা ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী । এ কারণে তাঁর  মা বেগম মাজেদ খাতুন কে রত্নগর্ভা বলা হতো  । কবিরুদ্দীন এর বাবা আমীর উদ্দিনও বেশ  নামকরা মানুষ  ছিলেন। আমীর উদ্দিন   ব্রিটিশ আমলে বাংলার নোঃ গভর্নর এর প্রাইভেট সেক্রেটারি ছিলেন। উপমহাদেশের বিখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ ফরায়েজি আন্দোলনের নেতা হাজী শরীয়তুল্লাহ এর পুত্র  দুদু মিয়া ছিলেন তাঁর  শ্বশুর।

পরিবার পরিচিতি

হুমায়ুন কবিরের বাবা কবিরুদ্দীন ১৮৮৯ সালে মাত্র ১২ বছর বয়সে বিয়ে করেন মাজেদা খাতুন নামের এক ৮ বছরের শিশুকে (হুমায়ুন কবিরের মা)। পরবর্তীতে তাদের ঘরে আসে আট সন্তান ( ৬ ছেলে ও ২ মেয়ে )। অর্থাৎ ,  হুমায়ুন কবিররা আট ভাই বোন ছিলেন। হুমায়ুন কবিরের বড় বোনের নাম দিলশাদ জাহান (  জন্ম – ১৮৯৮ সাল ), মেজো বোনের নাম ফরিদুন্নেসা  (জন্ম – ১২ ই জানুঃ ১৯০১ সাল ) ।  হুমায়ুন কবিরের বড় ভাই এর নাম শাহজাহান নুরুদ্দীন আমিরে কবির ( জন্ম -১৯০২ সাল) । তিনি জেদ্দায় কর্মরত অবস্থায় সেখনে বিয়ে করে সেখানকার নিবাসী হন। হুমায়ুন কবির ছিলেন ভাইদের মধ্যে  দ্বিতীয় । তাঁর তৃতীয় ভাই এর নাম ছিল জাহাঙ্গীর সাহাবুদ্দিন আমিরে কবির ( জন্ম- ১৯১০) । তিনি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মন্ত্রী ছিলেন । হুমায়ুন কবিরের ৪র্থ ভাইয়ের নাম আলমগির মহিউদ্দিন আমিরে কবির( জন্ম- ১৯১১ সাল )। তিনি ছিলেন পূর্ব বাংলার পুলিশের মহা পরিদর্শক(আই, জি )।  আলমগির কবির ১৯৭৮ সালে স্বাধীনতা পদক লাভ করেন। হুমায়ুন কবিরের ৫ম ভাইয়ের নাম আকবর আমিরুদ্দীন আমিরে কবির (জন্ম – ১৯১৫ সাল)। তিনি ছিলেন পাকিস্তান সরকারের সমাজকল্যান উপদেষ্টা ও পরে বাংলাদেশ সরকারের  তথ্য মন্ত্রনালয়ের  উপদেষ্টা। হুমায়ুন কবিরের ছোট ভাইয়ের নাম ফিরোজ মোসলেহ উদ্দিন আমিরে কবির (জন্ম- ১৯১৮) । তিনি কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়তেন এবং পরে তিনি চট্রগ্রামে নিবাস গড়েন।

শিক্ষা জীবন

হুমায়ুন কবিরের পরিবারের সকলেই ছিলেন শিক্ষিত ও সংস্কৃত  মনের অধিকারী। একজন মানুষের জীবনে শিক্ষার জন্য যতটুকু পরিবেশ দরকার তারা তার সবটুকুই পেয়েছেন। তাই উপযুক্ত পরিবেশ পেয়ে তিনি ও হয়েছিলেন প্রচণ্ড মেধাবী। হুমায়ুন কবিরের শিক্ষা জীবন শুরু হয় ১৯১২ সালে ৬ বছর বয়সে ।  এ সময় তিনি ভর্তি হন ঢাকার গ্রেগরিজ স্কুলে। তখন তাঁর বাবা কবিরুদ্দিন আহমেদ ছিলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট।  তিনি  ভাই শাহজান কবিরের সাথে স্কুলে যেতেন। হুমায়ুন কবিরের বাবার সরকারি চাকরির জন্য বিভিন্ন জেলায় কর্মরত ছিলেন বিধায় তাদের ও বিভিন্ন জেলায় থাকতে হয়েছে । ঢাকার গ্রেগরিজ স্কুলের পর তিনি ভর্তি হন কুমিল্লা জেলা স্কুলে। কুমিল্লা জেলা স্কুলে ছেড়ে আবার ভর্তি হন কৃষ্ণনগর  জিলা স্কুলে। এরপর তাঁর বাবার চাকুরী পরিবর্তনের ফলে আবার ভর্তি হন নওগাঁ কে, ডি হাই স্কুলে। আর এই নওগাঁ কে, ডি হাই স্কুল থেকেই তিনি ১৯২২ সালে রাজশাহী বিভাগে প্রথম হয়ে মেট্রিক পাস করেন।  প্রথম  থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত তিনি সব সময় ক্লাসে প্রথম ছিলেন। এরপর তিনি চলে যান কোলকাতায়। সেখানে ভর্তি  হন কলকাতা  প্রেসিডেন্সি কলেজে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ১৯২৪ সালে আই, এ পরীক্ষায় তিনি তৃতীয় স্থান অধিকার করেন। এরপর তিনি ভর্তি হন একই কলেজে ইংরেজিতে বি, এ অনার্সে । ১৯২৬ সালে তিনি প্রথম  শ্রেণীতে প্রথম হয়ে বি,এ পাশ করেন। তাঁর এ ফলাফল ছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের মুসলিম ছাত্রদের মধ্যে সর্বপ্রথম ইংরেজিতে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম। এরপর তিনি ভর্তি হন কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে এম এ ক্লাসে। ১৯২৮ সালে তিনি কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে এম এ পরীক্ষায়   ইংরেজিতে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম  হন । ১৯২৮ সালে তিনি সরকারি বৃত্তি পেয়ে ভর্তি হন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে বি,এ অনার্স ক্লাসে দর্শন, রাজনিতি ও অর্থনীতি বিভাগে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ও তিনি একই ফলাফল করেন। ১৯৩১ সালে হুমায়ুন কবির অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম  শ্রেণীতে প্রথম হয়ে দর্শন, রাজনিতি ও অর্থনীতি বিভাগে বি,এ অনার্স পাশ করেন। ১৯৩২ সালে তিনি পড়ালেখা শেষ করে দেশে ফিরে আসেন ।

বিবাহ বন্ধন ও পারিবারিক জীবন

হুমায়ুন কবিরের সহপাঠী ছিলেন শান্তি দেবী নামের এক ছাত্রী । তাদের গ্রামের বাড়ি ছিল হবিগঞ্জ জেলা। তবে তাদের পরিবার হবিগঞ্জ ছেড়ে কলকাতায় স্থায়ী নিবাস গড়েন। হুমায়ুন কবির ও শান্তি দেবী কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়তেন। সেখান থেকেই তাদের প্রেমের সম্পর্ক হয়। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফেরার  পর তিনি ১৯৩২ সালে ২ রা অক্টোবর অন্ধ্র বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শনের প্রভাষক থাকা কালীন  শান্তি দেবীকে  বিয়ে করেন। শান্তি দেবী ছিলেন হিন্দু পরিবারের সন্তান। তবে রক্ষণশীল মুসলিম সমাজ তাদের এই বিয়ে মেনে নেয়নি । এর জন্য তাঁকে অনেক সমস্যায় পড়তে হয়েছে। শান্তি দেবী ছিলেন তাঁর এক বছরের বড়। তাঁর জন্ম ১৯০৫ সালে ।

১৯৩৫ সালে  হুমায়ুন কবির ও শান্তি দেবীর ঘরে আসে এক  পুত্র সন্তান। তার নাম রাখা হয় প্রবাহন কামাল কবির। প্রবাহন কামাল কবির ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ফিজকম বিভাগের অধ্যাপক । এরপর ১৯৩৬ সালে তাঁদের ঘরে আসে এক কন্যা সন্তান । তাঁর নাম রাখা হয়  জয়তি লায়লা কবির। জয়তি লায়লা কবির ছিলেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রী। হুমায়ুন কবিরের স্ত্রী ও কন্যা লায়লা কবির ভারতীয় রেডক্রসের সাথে জড়িত ছিলেন।

চাকুরী  জীবন

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা শেষে তিনি দেশে ফিরে ১৯৩২ সালে ২ রা অক্টোবর অন্ধ্র বিশ্ববিদ্যালয় দর্শনের প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। এরপর তিনি ১৯৩৩ সালে যোগদান করেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন  বিভাগের প্রভাষক পদে। এক বছর পর তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক হিসেবে  পদন্নোতি পান  ।তিনি অন্ধ্র বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শনে অধ্যাপনার  পাশাপাশি ইংরেজি ও শিক্ষানীতি বিষয়ও পড়াতেন । তিনি ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, অন্ধ্র বিশ্ববিদ্যালয় ,মহীশুর বিশ্ববিদ্যালয় ও আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের পি, এইচ, ডি এক্সটারনাল । ১৯৩৭ সালে তিনি বাংলার প্রথম মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের রাজনৈতিক সচিব হিসেবে যোগদান করেন। তবে সচিব পদে যোগদান করলেও তিনি  শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে দেয়নি। তিনি এক সাথে দুটি কাজই  করতেন। তিনি  মাঝে মাঝে বিশ্ববিদ্যালয়ে লেকচার দিতে যেতেন । তবে তাঁর  বি এ এবং এম এ ক্লাস নেয়ার জন্য কোন পূর্ব প্রস্তুতি নিতে হত না । হঠাৎ করে ক্লাসে যেতেন এবং একটানা ক্লাস  নিতেন । ১৯৩৭ সালে তিনি শিক্ষামন্ত্রী মৌলানা আজাদের অনুরোধে  ভারতের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে যুগ্ম সচিব পদে যোগদান করেন। শিক্ষামন্ত্রী মৌলানা আজাদের সাথে তাঁর গভীর সম্পর্ক ছিল।  মৌলানা আজাদ তাঁর উর্দু ভাষায় লেখা ‘ Indian Freedom’  বইটি হুমায়ুন কবিরকে উৎসর্গ করেন। হুমায়ুন কবির ১৯৫০ সালে  ভারতের প্রথম ইউনিভারসিটি গ্র্যান্ড কমিশনের চেয়ারম্যান পদে যোগদান করেন। ১৯৫২ সালে তিনি যোগদান করেন ভারতের  শিক্ষা সচিব পদে। ১৯৫৫ সালে তিনি এ চাকরী ছেড়ে প্রধান মন্ত্রী জহুরলালা নেহেরুর কংগ্রেস পার্টীতে যোগদান করেন।

 

রাজনৈতিক জীবন

হুমায়ুন কবির ছিলেন একজন নামকরা রাজনীতিবিদ। মূলত ছাত্র জীবনেই  তাঁর রাজনীতিতে হাতেখড়ি  হয়। ১৯২০ সালে হুমায়ুন কবির যখন নওগাঁ কে, ডি হাই স্কুলের ছাত্র তখন তিনি জড়িত ছিলেন স্থানীয় সমাজ সেবা প্রতিষ্ঠান ‘’মিউচুয়াল বেনিফিট সোসাইটি’’তে  । তিনি ছিলেন এ প্রতিষ্ঠানের যুগ্ম সম্পাদক। কলেজ জীবনেও তিনি ছাত্র রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন ।১৯২৮ সালের দিকে তিনি উচ্চ শিক্ষার জন্য ভর্তি হন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯২৯ সালে তিনি সেখানে ভারতীয় মজলিসের সভাপতি নির্বাচিত হন। এরপর নির্বাচিত হন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউনিয়ন লাইব্রেরী সেক্রেটারি। ১৯৩১/৩২ সালে তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউনিয়ন সভাপতি পদে করেন। কিন্তু নির্বাচনে পরাজিত হন সামান্য ভোটের ব্যবধানে। ১৯৩২ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ফিরে আসেন। ১৯৩৩ সালে যখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন সে সময় তিনি ট্রেড ইউনিয়নের রাজনীতি করতেন।

এক সময় তিনি ছিলেন নিখিল ভারতের ছাত্র কংগ্রেস সভাপতি । এরপর তিনি ধীরে ধীরে পূর্ণাঙ্গ রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়েন। যোগ দেন  শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের কৃষক প্রজা পার্টীতে। ১৯৩৭ সালে কৃষক প্রজা পার্টী থেকে তাঁকে মনোনয়ন দেওয়া হয় ফরিদপুর নির্বাচনী  এলাকায়। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিখ্যাত রাজনীতিবিদ মৌলবি তমিজউদ্দিন খান। এই নির্বাচনে তিনি মৌলবি তমিজউদ্দিন খান এর কাছে পরাজিত হন। একই বছরে তিনি রেলওয়ে নির্বাচনী এলাকায় উপ নির্বাচনে জয় লাভ করে বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য হন। যোগ দেন মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের একান্ত সচিব হিসেবে। ১৯৪৬ সালে নির্বাচনে আবার তাঁকে রেলওয়ে নির্বাচনী এলাকায় মনোনয়ন দেওয়া হয়। এ সময় তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জ্যোতি বসু। কিন্তু জ্যোতি বসুর কাছে  তিনি এই নির্বাচনে পরাজিত হন। এক সময় তিনি কংগ্রেস এর সভাপতি মাওলানা আবুল কালাম আজাদ এর সংস্পর্শে আসেন। যোগ দেন কংগ্রেস পার্টীতে। মনোনীত হন কেন্দ্রীয় রেল প্রশাসনের সদস্য। তিনি সে সময় তিনটি ট্রেড ইউনিয়নের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৪৬ সালে তিনি কংগ্রেস এর সভাপতি মাওলানা আবুল কালাম আজাদ এর ব্যক্তিগত সচিব হন। এরপর দেশ ভাগ হয়। সৃষ্টি হয় দুটি দেশ ভারত ও পাকিস্তান। মাওলানা আবুল কালাম আজাদ এর সাথে তিনিও ভারতে থেকে যান। ১৯৪৭ সালে যোগ দেন ভারতের শিক্ষামন্ত্রনালয়ের যুগ্ম সচিব পদে। ১৯৫৫ সালে সরকারি চাকরী ছেড়ে দিয়ে ভারতের প্রধান মন্ত্রী জহুরলাল নেহেরুর কংগ্রেস পার্টীতে যোগদান করেন। কংগ্রেস প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন রাজ্য সভার নির্বাচনে। এ নির্বাচনে তিনি জয়ী হন। ১৯৫৬ সালে তিনি মনোনীত হন ভারতীয় সিভিল এ্যভিয়েশনএর প্রতিমন্ত্রী। ১৯৫৭ সালে তিনি নির্বাচন করেন পশ্চিম বাংলার বসিরহাট নির্বাচনী এলাকায়। ঐ নির্বাচনে তিনি লোকসভার সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি কলকাতার বন্দর বেঙ্গল আসাম রেলওয়ের এবং নিখিল ভারতের ডাক ও তার কর্মী ট্রেড ইউনিয়নের সভাপতি ছিলেন। ১৯৫৭ সালে তিনি বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও সাংস্কৃতিক মন্ত্রী হন। ১৯৫৮ সালে মাওলানা আবুল কালাম আজাদ এর মৃত্যু হলে তিনি  ভারতের শিক্ষামন্ত্রী হন। ১৯৬৪ সালে লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর শিক্ষামন্ত্রী নিযুক্ত হন। এরপর তাঁকে মনোনীত করা হয় ভারতের পেট্রলিয়াম মন্ত্রী। এই দায়িত্ব পালন করেন ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত। ১৯৬৬ সালে তিনি কংগ্রেস ত্যাগ করে প্রতিষ্ঠা করেন বাংলা কংগ্রেস। ১৯৬৭ সালে বাংলার কংগ্রেস লোকসভার সদস্য নির্বাচিত হন। বাংলার কংগ্রেস জাতীয় কংগ্রেস বিরোধী সরকার গঠন করে। এ সরকার গঠনে হুমায়ুন কবিরের ছিল মুখ্য ভূমিকা। তবে সেখানেও তিনি বেশি সময় থাকতে পারেননি। দলের অন্য সদস্যর সাথে বনিবনা না হওয়ায় তিনি দল ত্যাগ করে যোগ দেন ভারতীয় ক্রান্তি পার্টীতে। এরপর গঠন করেন লোকদল। এরপর তিনি রাজনীতিতে বেশি দূর এগুতে পারেনি। কারণ , লোকদল গঠনের দুই বছর পরই তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

সাহিত্য জীবন

হুমায়ুন কবির ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। রাজনীতি ও শিক্ষার পাশাপাশি সাহিত্যের ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান অনেক। স্কুল জীবন থেকে তিনি সাহিত্য চর্চা করে গেছেন। ১৯২০ সালে যখন তিনি কে, ডি হাই স্কুলের ছাত্র তখনই তিনি সম্পাদনা করেন স্কুলের বার্ষিক ম্যাগাজিন। প্রেসিডেন্সি কলেজের ম্যাগাজিন এর সম্পাদক ছিলেন। হুমায়ুন কবিরের প্রথম কাব্য গ্রন্থ হল ‘স্বপ্নসাধ’। ১৯২৮ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়ার সময় তিনি এই কাব্য রচনা করেছেন। ২য় কাব্য হল ‘ সাথী’ ।এটি প্রকাশ হয় ১৯৩০ সালে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি আই সি সি( ISIS) এবং চেরওয়েল (Cherwell) নামে দুটি পত্রিকা সম্পাদনা করেন। তখন তাঁর অনেক গুলো লেখা এই পত্রিকায় বের হয়। ১৯৩২ সালে তিনি ‘বারোমাসি’ নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা করেন। ১৯৩৬ সালে তিনি প্রকাশ করেন ইমানুয়েল ফাস্ট নামের একটি গ্রন্থ। ১৯৩৮ সালে তিনি ‘ সর্দার’ নামের একটি ছোট গল্প লেখেন বুলবুল পত্রিকায়। একই সালে প্রকাশ করেন তাঁর ৩য় কাব্য অষ্টাদশী । ১৯৪০ সালে প্রকাশ করেন জন স্টানলির বক্তব্য সমগ্র, ইংরেজি গ্রন্থ ‘পয়েন্ট মোনাডস এন্ড সোসাইটি্‌ , ১৯৪৩ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর বাংলার অনুবাদ গ্রন্থ মসদসে হালী এবং বাংলার মুসলিম রাজনীতি নিয়ে ‘ মুসলিম পলিট্রিক্স ইন বেঙ্গল’ । ১৯৪৫ সালে তিনি বাংলার আর্থ -সামাজিক বিষয় নিয়ে প্রকাশ করেন ‘বাংলার কাব্য’ রচনাটি। হুমায়ুন কবিরের বিখ্যাত গ্রন্থ হল ‘ নদী ও নারী ’ উপন্যাসটি। এটি প্রকাশিত হয় ১৯৪৫ সালে। একই বছর তিনি এই উপন্যাসটি ইংরেজিতে অনুবাদ করে এর নাম দেন ক্রান্ড রিভার্স । এই উপন্যাসটির প্রতিপাদ্য বিষয় হল পদ্মা পাড়ের মানুষের জীবন ও জীবিকা । পরবর্তীতে এই উপন্যাসটির উপর একটি চলচিত্র নির্মাণ করেন। কবি কাজী নজরুল ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে তাঁর গভীর সম্পর্ক ছিল। তিনি সময় পেলেই চলে যেতেন শান্তি নিকেতনে। কবি কাজী নজরুলও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও তাঁর বাসায় আসতেন।তাঁর  ইংরেজি ও বাংলা দুই ভাষার উপরই ছিল সমান দক্ষতা । কারণ ছাত্র থাকা কালে তিনি ইংরেজিতে সর্বাধিক নম্বর পেতেন। তিনি মূলত  দর্শন, শিক্ষা , সাহিত্য ও সামাজিক বিষয়ক প্রবন্ধ রচনা করেন।এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য রচনাগুলো হল  স্বপ্নসাধ’ (১৯২৮), ইমানুয়েল ফাস্ট (১৯৩৬),  বাংলার কাব্য’( ১৯৪৫), ‘ নদী ও নারী (১৯৪৫), সম্পর্কবাদ( ১৯৫১) , দিল্লী  ওয়াশিংটন মস্কো( ১৯৬৪), নয়া ভারতের শিক্ষা (১৯৫৫), স্টাডিজ অব বেঙ্গলি পোয়েট্রি (১৯৬৪), গ্রিন এন্ড গোল্ডস (১৯৫৮), দি বেঙ্গলী নভেল (১৯৬৮), এডুকেশন ফর টুমরো (১৯৬৮) ।

কবির রচিত ‘ মেঘনায় ঢল ’ কবিতাটি বাংলাদেশ সরকার ৪র্থ শ্রেণীর পাঠ্য বইতে অন্তর্ভুক্ত করে। আর এ  কবিতাটি যদি  ৪র্থ শ্রেণীর পাঠ্য বইতে অন্তর্ভুক্ত করা না হত, তবে হুমায়ুন কবির নামে যে একজন বিখ্যাত ব্যক্তি বাংলাদেশে জন্মে ছিলেন তা  গুটি কয়েক মানুষ ছাড়া অন্য কেউ জানতনা।

কবিতাটি পাঠকদের  স্বার্থে নিন্মে দেওয়া হল –

মেঘনায় ঢল

শোন্ মা আমিনা, রেখে দে রে কাজ ত্বরা করি মাঠে চল,

এল মেঘনায় জোয়ারের বেলা এখনি নামিবে ঢল।

নদীর কিনার ঘন ঘাসে ভরা

মাঠ থেকে গরু নিয়ে আয় ত্বরা

করিস না দেরি- আসিয়া পড়িবে সহসা অথই জল

মাঠ থেকে গরু নিয়ে আয় ত্বরা মেঘনায় নামে ঢল।

এখনো যে মেয়ে আসে নাই ফিরে- দুপুর যে বয়ে যায়।

ভরা জোয়ারের মেঘনার জল কূলে কূলে উছলায়।

নদীর কিনার জলে একাকার,

যেদিকে তাকাই অথই পাথার,

দেখতো গোহালে গরুগুলি রেখে গিয়েছে কি ও পাড়ায়?

এখনো ফিরিয়া আসে নাই সে কি? দুপুর যে বয়ে যায়।

ভরবেলা গেলো, ভাটা পড়ে আসে, আঁধার জমিছে আসি,

এখনো তবুও এলো না ফিরিয়া আমিনা সর্বনাশী।

দেখ্ দেখ্ দূরে মাঝ-দরিয়ায়,

কাল চুল যেন ঐ দেখা যায়-

কাহার শাড়ির আঁচল-আভাস সহসা উঠিছে ভাসি?

আমিনারে মোর নিল কি টানিয়া মেঘনা সর্বনাশী।

হুমায়ুন কবির যদি রাজনীতিতে না জড়াতেন তবে তাঁর রচনা ভাণ্ডার আরোও  সমৃদ্ধ  হত। সাহিত্যের ক্ষেত্রে সময় দেয়ার মত সুযোগ তিনি পাননি। কারণ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন। এরপরও তিনি যে সব রচনা করে গেছেন তা আমাদের মাঝে অমর হয়ে থাকবে ।

 

হুমায়ুন কবিরের অবদান

সাহিত্য, শিক্ষা , রাজনীতি ও সমাজ সেবা  সকল ক্ষেত্রেই হুমায়ুন কবিরের অসামান্য অবদান। স্কুল জীবনে তিনি জড়িত ছিলেন সমাজসেবা মূলক প্রতিষ্ঠানে। তিনি যখন তিন-চারটি ট্রেড ইউনিয়নের সভাপতি ছিলেন তখন শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে নিরলস   কাজ করে গেছেন। পশ্চিম বঙ্গের বাংলার কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা করে নতুন মন্ত্রীসভা গঠনে তিনি অনেক অবদান রাখেন। ভারতের শিক্ষামন্ত্রী থাকা অবস্থায় একটি আধুনিক শিক্ষানীতি প্রয়োগে তিনি মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। দরিদ্র ও অবহেলিত প্রাইমারি  শিক্ষকদের বেতন ও অন্যান্য সুবিধার কথা চিন্তা করে একটি আদর্শ নীতি প্রণয়ন করেন। ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতি রক্ষার্থে  ভারতের প্রত্যেক রাজ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামে একটি করে প্রেক্ষাগৃহ তৈরির উদ্যোগ নেন। তিনি জীবনে যা আয় করেছেন সবই বিলিয়ে দিয়েছেন গরিবদুঃখীদের মাঝে। ১৯৫৭ সালে মাওলানা ভাষানির সম্মেলন সফল করার জন্য তিনি যথেষ্ট ভূমিকা রাখেন। তিনি মুসলমান ছেলেদের জন্য উচ্চ  শিক্ষার ব্যবস্থা করেন। এক সময় বাঙ্গালী সাহিত্যিকদের অনেক অবহেলা করা হত। কিন্তু তিনি শিক্ষা মন্ত্রী থাকা অবস্থায় অনেক বাঙ্গালী বাংলা একাডেমীর পুরষ্কার পান।তাঁর প্রতিষ্ঠিত পত্রিকায় তরুণ লেখকদের অগ্রাধিকার থাকত। তাঁর পত্রিকার মাধ্যমেই কবি আবুল হোসেন, শওকত ওসমান, আহসান হাবিব ও ফররুখ আহমদের মত অনেক তরুণ লেখকের আত্নপ্রকাশ ঘটে। তিনি আমাদের মাঝে যে সাহিত্য ভাণ্ডার রেখে গেছেন তা নতুন সাহিত্যিক সৃষ্টিতে অনুপ্রেরনা হয়ে থাকবে যুগের পর যুগ।

 

পুরষ্কার

বহুমুখী প্রতিভার জন্য হুমায়ুন কবির স্বীকৃতিও কম পাননি। সাহিত্য, শিক্ষা , রাজনীতি সকল ক্ষেত্রেই অসামান্য অবদানের জন্য অন্নোমানাই, বিশ্ব ভারতী, আলীগড় ,মহিশুর, এথেন্সসহ আরও কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে বিশেষ সম্মানে ভূষিত করেন এবং কবিকে ডি, লিট ডিগ্রি প্রদান করেন।

 

মৃত্যু

১৯৬৯ সালের ১৮আগস্ট  তিনি হৃদরোগে আক্রন্ত হলে তাঁকে ভর্তি করা হয় কলকাতার একটি হাসপাতালে। সেখানে ডাক্তাররা শত চেষ্টা  করেও তাঁকে বাঁচাতে পারেনি । সেখনেই তিনি শেষ নিঃষাস ত্যাগ করেন। তাঁর  মৃত্যুতে বাঙ্গালী হারায় একজন বিশ্ববরেন্য রাজনীতিবিদ, সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদকে । মৃত্যুর পর তাঁকে সমাহিত করা হয় দিল্লীর জামিয়া মিলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে। এখানেই শেষ  হয় বাঙ্গালী জাতির এক গর্বের অধ্যায়।

 

লেখক

এম এম রেদোয়ান আহমেদ মাসুদ রানা

হীরালাল সেন

 

             হীরালাল সেন

প্রাথমিক পরিচয়

হীরালাল সেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক অনন্য নাম। তাঁকে উপমহাদেশের চলচ্চিত্রের জনকও বলা হয় । তাঁর  হাত ধরেই ভারতীয় উপমহাদেশে চলচ্চিত্রের এক নতুন দিগন্ত রচিত হয়। তিনিই প্রথম নির্মাণ করেন বিজ্ঞাপন বিষয়ক চলচ্চিত্র । ভারতের প্রথম রাজনীতি বিষয়ক চলচ্চিত্রের সূচনাও হয় তাঁর হাতেই ।

 

জন্ম ও বংশ পরিচয়

বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার হীরালাল সেন ১৮৬৬ সালে তৎকালীন ঢাকা জেলার মানিকগঞ্জ মহকুমার বগজুরি গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তবে তাঁর জন্ম তারিখ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। তাঁর বাবার নাম ছিল চন্দ্রমোহন সেন ও  মায়ের নাম বিধুমুখী। হীরালাল সেন এর পারিবারিক বংশ ছিল মুনশী।

 

পরিবার পরিচিতি

হীরালাল সেন ছিলেন মানিকগঞ্জের এক বিখ্যাত পরিবারের সন্তান । তাঁর পূর্বপুরুষের নাম ছিল বাঞ্ছারাম মুনশি ।  বাঞ্ছারাম মুনশির ছিল দুই ছেলে শ্রিকন্ঠ ও উগ্রন্ঠ মুনশি । শ্রিকণ্ঠ মুনশির ছেলের নাম গোকুল মুনশি । গোকুল মুনশির ছিল চার সন্তান দীনলাল সেন, চন্দ্রমোহন সেন, শ্রিমোহন সেন, ও পলতারু দেবী। গোকুল মুনশির চার সন্তানের মধ্যে দীনলাল সেন বেশি পরিচিতি লাভ করেন। তিনি এক সময় ত্রিপুরার মহারাজার মন্ত্রী ছিলেন। ১৮৯৮ সালে দীনলাল সেন মারা যান।

হীরালাল সেন এর বাবা চন্দ্রমোহন সেন ছিলেন ঢাকা জর্জ কোর্টের উকিল। পরবর্তীতে তিনি ঢাকা ছেড়ে কলকাতায় চলে যান এবং কলকাতায় আবার ওকালতি ব্যবসা শুরু  করেন। হীরালাল সেনের মা ছি্লেন গৃহিণী । বিখ্যাত ইতিহাসবিদ ডঃ দীনেশ চদ্র সেন ছিলেন হীরালাল সেন এর ফুফাত ভাই। হীরালাল সেনের ফুফুর নাম ছিল পলতারু দেবী । ডঃ দীনেশ চন্দ্র সেন হীরালাল সেনের বাড়িতে জন্ম গ্রহণ করেন। হীরালাল সেন ছিলেন ডঃ দীনেশ চন্দ্র সেন এর দুই বছরের ছোট । তিনি হীরালাল সেনের বাড়িতে থেকেই পড়ালেখা করেন। চন্দ্রমোহন সেন ও বিষুমূয়ী্র ছিল আট সন্তান। তবে তাদের মধ্যে ৫ জনের নাম জানা যায় । তারা হলেন সুন্দরী দেবী, হীরালাল সেন, দেববাসী লাল সেন, মতিলাল সেন ও সোরজিনী দেবী ।

শৈশব কাল

হীরালাল সেনের শৈশব কাল কেটেছিল তাদের গ্রামের বাড়িতে। সেখানে তিনি সারা দিন খেলাধুলা করতেন গ্রামের আট দশটি ছেলের মতই। সেখানে কোন ভেদাভেদ ছিলনা। সবাই মিলে নদীতে সাঁতার কাটতেন, গাছে উঠতেন ও মাটি দিয়ে খেলা করতেন। তবে তিনি খেলেধুলার পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের ছবিও আঁকতেন। তাঁর শৈশব কালের সাথী ছিল তাঁর ফুফাত ভাই ডঃ দীনেশ চন্দ্র সেন।

শিক্ষা জীবন

হীরালাল সেনের শিক্ষা জীবন শুরু হয় মানিকগঞ্জের বগজুরি গ্রাম থেকেই।  তিনি প্রথম অবস্থাতে তিনি পরিবার  থেকে ই শিক্ষা গ্রহন করেন । হীরালাল সেন ও ডঃ দীনেশ চন্দ্র সেন ছিলেন  সমবয়সী । তাঁদের ফারসি ভাষা শেখানোর জন্য একজন মৌলভী রাখা হয়। তারা  তাঁর  কাছে ফারসি ভাষা শেখেন। ধারনা করা হয়, হীরালাল সেন মানিকগঞ্জের মাইনর স্কুলে পড়ালেখা করেছেন। এরপর  ১৮৯৫-১৮৯৬ সালের দিকে  হীরালাল সেন ভর্তি হন কলেজিয়েট স্কুলে। তাঁর বাবাসহ পরিবারের  সকলেই কলকাতায় চলে যাওয়ার ফলে তিনি সেখানে একটি কলেজে আই, এস, সি তে ভর্তি হন। পড়ালেখার প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল কম। কলেজে পড়া অবস্থাতেই তিনি চলচ্চিত্রের সাথে জড়িয়ে পড়েন এবং সেখানেই তিনি পড়ালেখার ইতি টানেন।

সংসার জীবন

হীরালাল সেন সম্ভবত ১৯০০ সালের কাছাকাছি সময়ে বিয়ে করেন। তবে এ নিয়ে মতভেদ আছে।  হীরালাল সেনের ঘরে আসে তিন সন্তান। ১৯০২ সালে জন্ম গ্রহণ করেন প্রথম সন্তান বৈদ্যনাথ সেন।  তাঁর তৃতীয় সন্তানের নাম ছিল প্রতিভা সেন।

চলচ্চিত্রের সুচনা

হীরালাল সেন ছাত্র অবস্থাই চলচ্চিত্রের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন।  ১৯০০ সালে ফরাসি কোম্পানি ভারতীয় উপমহাদেশের রাজাদের রাজ্যের হাতি, ঘোড়া, উট , ইত্যাদি সহ শোভাযাত্রা , সাপের খেলাসহ বিভিন্ন ধরনের খেলার ছবি তুলে ইউরোপ, আমেরিকায় দেখাত। আর এর জন্য তারা এদেশে কিছু ক্যামেরাম্যান নিয়ে আসেন ছবি তোলার জন্য। তিনি তাদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক করেন এবং তাদের কাছ থেকে ক্যামেরা চালানো  শেখেন ।

 কর্ম জীবন

হীরালাল সেনের কর্ম জীবন শুরু হয় চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। আই, এস, সি পড়ার সময় তিনি পড়ালেখা বাদ দিয়েই চলচ্চিত্র পেশায় যোগদেন। ১৮৯৮ সালে হীরালাল সেন ও তার ভাই মতিলাল সেন রয়েল বায়োস্কোপ কোম্পনি। এরপর শুরু করে দেন বিভিন্ন ধরনের প্রদর্শনী । ১৮৯৯ সালে মিনারভা রঙ্গমঞ্চ ভাড়া করে একটি প্রদর্শনী করে যা অনেক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। এই সব প্রদর্শনীতে সাফল্য অর্জন করার পর তিনি চিত্র নির্মাণের চিন্তা শুরু করেন। কিন্তু তাঁর নিজের কোন ক্যামেরা ছিলনা। প্যাথে ফ্রেবিজা ও আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ক্যামেরা ভাড়া নিয়ে অনেক ধরনের ছবি তোলা শুরু করেন। কিছু দিন পর নিজেই ক্যামেরা কেনার চিন্তা করেন। ১৯০০ সালে রয়েল বায়স্কোপ কোম্পানি লন্ডন ওয়ারউইক ট্রেডিং কোম্পানি থেকে ক্যামেরা প্রজেক্টিং মেশিন ও বিভিন্ন ধরনের চলচ্চিত্রের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আমদানি করে। হীরালাল সেন এরপর থেকে শুরু করেন নিজের ক্যামেরা দিয়ে ছবি তোলা ও চলচ্চিত্র নির্মাণ। হীরালাল সেনের সুনাম দ্রুত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। নিজের ক্যামেরা দিয়ে তোলা ছবির প্রদর্শনীতে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেন।

১৯০১ সালে ৯ ই ফেব্রুয়ারি ক্লাসিক থিয়েতার চিত্রায়িত করেন কিছু বাংলা নাটকের বিশেষ বিশেষ দৃশ্য । এর মধ্য ছিল আলী বাবা, যীতারাম , হরিপদ ,ভ্রমর , সরলা, দোলযাত্রা, বন্ধু ইত্যাদি।১৯০১ সালের ১৩ ডিসেম্বর  তিনি ব্যবসায়িকভাবে চিত্র প্রদর্শনী শুরু করে। তাঁর প্রদর্শনী দেখার জন্য আসেন প্রধান বিচারপতি স্যার উইলিয়াম ম্যাকমিলান। হীরালাল সেন তাঁর নিজ গ্রাম বগজুরিতে চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করেন। তিনি তাঁর বাড়ির কাদের নাট মন্দিরে ১৯০২ থেকে ১৯০৫ সালে পর্যন্ত তিনি প্রদর্শনী চালু রাখেন। ১৯০০ সালে ২ ফেব্রুয়ারি  তার প্রতিষ্টিত রয়েল বায়স্কোপ কোম্পানি কলকাতার বিভিন্ন বিখ্যাত ব্যক্তির বাসভবনে প্রদর্শনী করেন । তিনি একই সময়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন গ্রামে গঞ্জে এবং উড়িষ্যা উত্তর প্রদেশে ও বিহারে বিভিন্ন স্থানে বায়স্কোপ প্রদর্শন করেন। ১৮৯০ সালে ৪ এপ্রিল হীরালাল সেন তার ছোট ভাই মতিলাল সেন ও দোকিলাল সেন এবং তাঁর বোনের ছেলে ডোলনাথ সেন কে নিয়ে ‘’ দি রয়েল বায়োস্কোপ কোম্পানি ব্যানারে প্রথম চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করেন। ১৮৯০ সালে তিনি তার নিজ গ্রামে বগজুরিতে প্রতিষ্টা করেন ফটোগ্রাফি প্রতিষ্ঠান, অমরাবতী ফাইন আর্টস এসোসিয়েশন এবং এইচ,এল সেন এ্যান্ড ব্রাদার্স। বাংলা ১৩০৯ সালে ২৬-২৭ ফাল্গুন ১৯০২ সালে তিনি শরীয়তপুর জেলার পালং  থানায় ( শরীয়তপুর সদর )বয়স্কোপ প্রদর্শনী করেন। তিনি যখন ঢাকার কলেজিয়েট স্কুলে পড়তেন তখনই তিনি ফটোগ্রাফির প্রতি আকৃষ্ট হন।

শেষ জীবন 

হীরালাল সেন এর শেষ জীবন কেটেছে খুব কষ্টে। জীবনের শেষ সময়ে তাকে অনেক কঠিন পরিস্তিতির মোকাবেলা করতে হয়েছে । ১৯০৫ সালের পর থেকেতাঁর চলচ্চিত্র জীবনের পতন শুরু হয়। আস্তে আস্তে দেশে চলচ্চিত্রের বিভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠান হতে থাকে। এতে চলচ্চিত্রের প্রতিযোগিতা শুরু হয়। এছাড়াও সে সময় দেশ বিদেশ থেকে বিভিন্ন ধরনের নামকরা চলচ্চিত্র আমদানি শুরু হয়। এতে সাধারন  জনগণ দেশিয় খণ্ড খণ্ড চিত্রের প্রতি আগ্রহ হঁড়িয়ে ফেলে। বিদেশী চলচ্চিত্রের আমদানির ফলে তাঁর জীবনের সব সাধনা  ধীরে ধীরে ভেস্তে যায়।

হীরালাল সেনের তিন ভাই মিলে চলচ্চিত্র ব্যবসা করতেন। একসময় তাঁর ভাই  দেববাসী  লাল সেন চলচ্চিত্র ছেড়ে দিয়ে চাকরী ধরেন। সাথে থাকেন মতিলাল সেন। কিন্তু এক সময় হীরালাল সেন ও মতিলাল সেনেরমধ্যে চরম দ্বন্দ্ব শুরু হয়। এরপর হীরালাল সেন তাঁর প্রতিপক্ষ রয়েল বায়োস্কোপ কোম্পানি ত্যাগ করেন। হীরালাল সেন তাঁর ভাগ্নে কুমার সংকর গুপ্তকেও চলচ্চিত্র এনেছিলেন। কুমার সংকর গুপ্ত ও  চলচ্চিত্র সম্পর্কে শিক্ষা নেন হীরালাল সেনের কাছ থেকে। কিন্তু এক সময় তাঁর ভগ্নে ও তাকে ছেড়ে অন্য কোম্পানিতে  চলে যান । এরপর হীরালাল সেন এইচ,এল সেন কোম্পানিতে কাজ করেন। পরে তিনি এই কোম্পানি ছেড়ে তাঁর ভাগ্নের প্রতিষ্টিত লন্ডন বায়োস্কোপ কোম্পানিতে যোগদান করেন।

১৯১৩ সালের কোন এক সময়ে হীরালাল সেনের জীবনে ঘটে সবচেয়ে বড় এক দুঃখজনক ঘটনা । হীরালাল সেনের নির্মিত সব চলচ্চিত্র ও নথিপত্র ছিল তাঁর ভাই মতিলাল সেনের বাসায়। হঠাৎ  একদিন মতিলাল সেন এর বাসায় আগুন  লেগে  যায়।  হীরালাল সেনের নির্মিত সব চলচ্চিত্র ও নথিপত আগুনে পুড়ে যায়। মতিলাল সেন এর কন্যা ও আগুনে পুড়ে মারা যায়। তখন শুরু হয় হীরালাল সেনের সবচেয়ে বড় বিপর্যয় । একদিকে পারিবারিক দ্বন্দ্ব অন্যদিকে তাঁর নির্মিত সব কিছু হারানোর বেদনা । আর্থিক অভাবের ফলে তাঁর ক্যামেরা ও সকল যন্ত্রপাতি এবং হাতের আংটি মালিকের কাছে বন্ধক রাখেন। পরবর্তীতে অনাদি বসু এগুলো মালিকের কাছ থেকে ছাড়িয়ে নেন। বিখ্যাত ক্যামেরাম্যান দেবী ঘোষ ক্যামেরাগুলো মেরামত করে নিজে ব্যবহার করেন।

উপমহাদেশের বিজ্ঞাপনের জনক

হীরালাল সেনকে উপমহাদেশের বিজ্ঞাপনের জনক বলা হয়। তাঁর আগে কেউ ভারতে বিজ্ঞাপন চিত্র তৈরি করেনি। ১৯০৩ সালে তিনি বিজ্ঞাপন চিত্র তৈরি করেন। তিনি বিভিন্ন ধরনের বিজ্ঞাপনের তৈরি করেন, তার মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য হল – বটফেষ্ট পালের ‘এডওয়ার্স টনিক’,  সি কে সেনের মাথার তেল জবাকুসুম ও ডব্লিউ মেজর কোম্পানির ‘ সালমা পিলা’ । এ বিজ্ঞাপনগুলো হয়েছিল রয়েল বায়োস্কোপ কোম্পানি থেকে।

উপমহাদেশের প্রথম রাজনৈতিক চলচ্চিত্রের নির্মাণ

১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন শুরু হয়। ১৯০৫ সালের ৭ ই আগষ্ট রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় কলকাতায় বিশাল প্রতিবাদ সভার ডাক দেন। হীরালাল সেন এই সভার ভিডিও করেন। এছাড়া রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় এর নেতৃত্বে কলকাতায় বিশাল প্রতিবাদ সভা ও মিছিল হয়েছিল তার  ছবি ও তুলেছেন তিনি। ১৯০৫ সালে ২৫শে নভেম্বর রাত্র ৯ টায় কলকাতায় থিয়েটার হলে এই চিত্রের প্রদর্শনী করা হয়েছে। এই প্রদর্শনীতে রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন। এছাড়াও তাঁর সাথে এসেছিলেন ময়মনসিংহের মহারাজা ‘ সূর্য কান্ত আচার্য চৌধরী, নাটকের রাজা জগদীন্দ্র নাথ রায়সহ অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গ । রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর প্রদর্শনী দেখে খুবই প্রশংসা করেছিলেন। এমনকি তিনি হীরালাল সেনের পায়ের ধুলো মাথায় তুলে নিয়েছিলেন।

হীরালাল সেনের চলচ্চিত্র

হীরালাল সেন কতগুলো চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন তার সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি । তবে বিভিন্ন সুত্রে জানা যায়,তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্র  ৪০ টির মত হবে। তবে বিভিন্ন উৎস থেকে বিভিন্ন ধরনের মতবাদ রয়েছে।

মৃত্যু

হীরালাল সেন নানা প্রতিকূলতার মধ্যে  ধীরে ধীরে অসুস্থ হয়ে পড়েন। ১৯১৭ সালে তাঁর শরীরে ধরা পড়ে দুরারোগ্য ক্যান্সার। অবশেষে তিনি ১৯১৭ সালের অক্টোবর মাসে ক্যান্সারের সাথে লড়ে মৃত্যুবরণ করেন এবং সেই সাথে শেষ হয় চলচ্চিত্র জগতের এক উজ্জল নক্ষত্রের অধ্যায়।
লেখক
এম এম রেদোয়ান আহমেদ মাসুদ রানা
ব্রাক বিশ্ববিদ্যালয়।