বারমুডা ট্রায়াঙ্গলে উধাও হওয়া জাহাজগুলোর গল্প

বারমুডা ট্রায়াঙ্গল (Image Source: GETTY STOCK IMAGE)

তৌফিক মাহমুদ:বারমুডা ট্রায়াঙ্গল, যা কিনা ‘Devil’s Triangle’ নামেও পরিচিত, এই পৃথিবীর একটি অন্যতম রহস্যাবৃত অঞ্চল। এর অবস্থান আটলান্টিক মহাসাগরে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় উপকূলে বারমুডা, ফ্লোরিডা ও পুয়ের্তো রিকোর মধ্যবর্তী স্থানে। যুগ যুগ ধরে এটি অমীমাংসিত রহস্যের এক কেন্দ্রবিন্দুতে রূপ নিয়েছে। ৪৪০০০০ মাইল সমুদ্র এলাকাজুড়ে অবস্থিত বারমুডা ট্রায়াঙ্গল বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত জাহাজ চলাচলের রুট। এই পথেই আমেরিকা, ইউরোপ ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে পণ্য আমদানি রপ্তানি করে অসংখ্য ছোট-বড় জাহাজ।কিন্তু ব্যাখ্যাতীত বিভিন্ন ঘটনা ও কুসংস্কারকে কেন্দ্র করেই আজ এটি বহুল আলোচিত। শত শত বছর ধরে বহুসংখ্যক জাহাজ ও উড়োজাহাজ রহস্যজনকভাবে এই অঞ্চল থেকে উধাও হয়ে গিয়েছে। এছাড়াও বিগত কয়েক দশকে হাজার হাজার মানুষের হারিয়ে যাওয়ার জন্যেও বারমুডা ট্রায়াঙ্গল কে ‘ devil’s triangle ‘ বা শয়তানের আস্তানা হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়েছে।

‘বারমুডা ট্রায়াঙ্গল’ এই শব্দটি প্রথম ব্যবহৃত হয় ভিনসেন্ট গ্যাডিস এর দ্বারা ‘এ্যারগোসি ‘ ম্যাগাজিনে। বারমুডা ট্রায়াঙ্গল কে ঘিরে গল্পের সূচনা সেই ক্রিস্টোফার কলম্বাসের সময় থেকে। কলোম্বাস যখন নতুন দিগন্ত উন্মোচনে প্রথম স্পেন থেকে বেরিয়ে এই অঞ্চলে এসেছিল, তখন সে এই অঞ্চলে আকাশ হতে আগুনের শিখা সমুদ্রের বুকে আছড়ে পড়তে দেখেছিল। কিন্তু জনমানুষের নিকট এই অঞ্চলের রহস্যময়ী আচরণ নিয়ে আগ্রহের সৃষ্টি হয় বিংশ শতাব্দীতে,যখন যুক্তরাষ্ট্রের একটি কার্গো জাহাজ ইউএসএস সাইক্লপস ৩০০ জন যাত্রী সমেত বারমুডা ট্রায়াঙ্গাল এ নিখোঁজ হয়। এইরকম আরো অনেক দূর্ঘটনা প্রায়শই রহস্যাবৃত ও অবিরতভাবে বারমুডা ট্রায়াঙ্গল এ ঘটার ফলে, অনেকেই এই বিষয় নিয়ে অনেক ব্যাখ্যা ও তত্ত্ব দাঁড় করাতে চেয়েছেন। অনেক আজব আজব তত্ত্ব, সময় সুড়ঙ্গ তত্ত্ব, এলিয়েন তত্ত্ব এর পাশাপাশি অনেকেই চেয়েছেন যৌক্তিকভাবে এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিতে। এর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হচ্ছে বিদ্যুৎচুম্বকীয় প্রভাবের তত্ত্ব , যা কিনা কম্পাসের দিক নির্ণয়ে সমস্যার সৃষ্টি করে এবং পৃথিবীর ভূচুম্বক কর্তৃক অতিমাত্রায় আকর্ষণের ফলে জাহাজ ও উড়োজাহাজ গুলোর জটিল ও সূক্ষ্ম যন্ত্রগুলো ঠিক মতো কাজ করতে না পেরে ভুল পথে চালিত হয়ে বিপদের সম্মুখীন হয়। আবার কেউ বলেছেন এই অঞ্চলে ষড়ভূজ আকারের মেঘ এর সৃষ্টি হয়, ফলে এখানে ১৭০ মাইল পর্যন্ত বাতাসের গতিবেগ হয়ে থাকে। আর এর ফলে সৃষ্ট এয়ার পকেটগুলোই জাহাজ ও উড়োজাহাজ গুলোর দূর্ঘটনার জন্য দায়ী। তবে এখন পর্যন্ত কোন তত্ত্ব ই বাস্তবসম্মত ব্যাখ্যা দিতে পারেনি। আবার অনেকেই ধারণা করেন যে এই অঞ্চলে অস্বাভাবিক কিছুই নেই। কারণ অধিকাংশ দূর্ঘটনা গুলোই অতিরঞ্জিত ও কাল্পনিক গল্পের মতো মানুষের কাছে বর্ণিত হয়ে থাকে। তাদের মতে এই রুটে জাহাজ চলাচলের পরিমাণ বেশি তাই দূর্ঘটনাও বেশি হয়ে থাকে। যদিও এখন পর্যন্ত কোন নিরেট ও প্রমাণিত তত্ত্বের দেখা মেলেনি এই রহস্য উদঘাটনে, তবুও দূর্ঘটনা ঘটেই চলছে প্রতিবছর। আর বিভিন্ন কিংবদন্তি উপকথার সৃষ্টি হয়েছে অনেকগুলো জাহাজের উধাও হয়ে যাওয়ার মাধ্যমে। এইখানে তাই আজকে সবচেয়ে আলোচিত ও অমীমাংসিত জাহাজ দূর্ঘটনাগুলোর কথা উল্লেখ করা হল।

১. ম্যারি সিলেস্টা

সম্ভবত জাহাজ সম্পর্কিত অন্যতম রহস্যময় ঘটনাগুলোর এটি হচ্ছে একটি। এ যেন পুরো জাহাজটা নিজেই একটা গল্প হয়ে আছে।

জাহাজটি নিউইয়র্ক থেকে ইতালির জেনোয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিল। ৭ জন ক্রু সহ ক্যাপ্টেন বেঞ্জামিন ব্রিগস ও তার স্ত্রী এবং তাদের দুই বছর বয়সী এক কন্যা সন্তান জাহাজটিতে অবস্থান করছিলো। জাহাজটি raw অ্যালকোহল ভর্তি ছিল। যাত্রা শুরুর কিছুদিন পর ৪ ঠা ডিসেম্বর, ১৮৭২ সালে যখন একটি ব্রিটিশ জাহাজ Dei Gratia মেরি সিলেস্টা কে অতিক্রম করে যাচ্ছে তখন এর পাল নামে মাত্র তোলা ছিল এবং জাহাজটি Azores দ্বীপের নিকটবর্তী আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে মানুষ বিহীন অবস্থায় ভাসমান ছিল। জাহাজটির লাইফবোটগুলো ছিলো না, কার্গোর ৯ টি ব্যারেল খালি ছিল এবং জাহাজের ডেকের উপর একটি তলোয়ার ছিল। জাহাজের মানুষগুলো ও লাইফবোটের কোন হদিস পাওয়া যায়নি। অনেক চিন্তাভাবনা করেও এটাকে জলদস্যু দ্বারা আক্রান্ত জাহাজ বলে মনে হয়নি তাদের। কেননা ক্রুদের যাবতীয় মূল্যবান সামগ্রী ও অ্যালকোহলের ব্যারেলগুলোতে অন্য কেউ স্পর্শ পর্যন্ত করেনি।

এই নিয়ে পরবর্তী সময়ে এলিয়েন দ্বারা অপহৃত হওয়ার তত্ত্ব, দৈত্যাকার স্কুইড দ্বারা আক্রান্ত হবার তত্ত্ব গড়ে তোলা হয়েছে। এছাড়াও প্রাকৃতিক দুর্যোগ এর কথাও অনেকে উল্লেখ করেছেন। অনেকে সমুদ্র তলদেশে সংঘটিত ভূকম্পন এর সম্ভাবনার কথা বলেছেন। আবার অনেকেই বারমুডা ট্রায়াঙ্গল এর অনুপ্রবেশকে কারণ হিসেবে দায়ী করেছেন।

কিন্তু যত যাই হোক, এর মধ্য কোনটিই নিরেট ও সন্তোষজনক নয়। কেনই বা একটি জাহাজের দক্ষ নাবিকেরা, ভালো আবহাওয়া থাকা সত্ত্বেও নিজ জাহাজ পরিত্যাগ করে উধাও হয়ে যাবেন?

২. এলেন অস্টিন

এটি হচ্ছে ২১০ ফুট লম্বা ১৮৮১ সালের আমেরিকান জাহাজ এলেন অস্টিন এর সাথে ঘটে যাওয়া এক রহস্য। জাহাজটি লন্ডন থেকে নিউইয়র্ক এর দিকে যাচ্ছিলো। কিন্তু বারমুডা ট্রায়াঙ্গল এর নিকটবর্তী এটি একটি প্রায় পরিত্যক্ত ও জরাজীর্ণ জাহাজ দেখে ভড়কে যায়। জাহাজটির ক্রু বাদে বাকি সবকিছুই ঠিকঠাক লাগছিলো। তারপরেও সতর্কতা সরূপ এলেন অস্টিন এর ক্যাপ্টেন ব্যাকার ঐ জাহাজটি ২ দিন পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করতে বলেন তার ক্রুদের, নিশ্চিত হবার জন্য যে এটি কোনো ফাঁদ নয়। ২ দিন পর ক্যাপ্টেন ক্রুসহ ঐ পরিত্যাক্ত জাহাজটিতে প্রবেশ করেন। জাহাজটিতে কোন ক্রুর চিহ্ন পর্যন্ত ছিল না। এলেন অস্টিন এর সাথে এটিকে তীরে নিয়ে আসার জন্য একজন ক্রু নিয়োগ করলেন ক্যাপ্টেন। ২ দিন পর্যন্ত সমুদ্রের শান্ত জলরাশি পারি দেবার পর আকস্মিক ঝড়ের কবলে পড়ে জাহাজ ২ টির গতিপথ ভিন্ন হয়ে যায়।

ঐ ঝড়ের পর কথিত গল্পানুসারে ক্যাপ্টেন বেকারের নাবিকেরা পরিত্যাক্ত জাহাজটির পুনরায় হদিস পায়।

 

এবং কয়েক ঘন্টার চেষ্টায় জাহাজটি ধরতে সমর্থ হয়। কিন্তু অদ্ভূতভাবে জাহাজটিতে কেউই ছিল না।গল্পের অন্য একটি ধারা বলে যে, এলেন অস্টিন জাহাজটির আরো একবার পরিত্যক্ত জাহাজটিকে তীরের নিকটবর্তী আনার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। পরিত্যক্ত জাহাজটির উধাও হয়ে যাওয়া, পুনরায় দৃশ্যমান হওয়া এবং আবার উধাও হয়ে যাওয়া সত্যিই এক রহস্যের অবতারণা করেছিল।

 

৩. ইউএসএস সাইক্লপস

ইউএস নেভীর অন্যতম বৃহৎ একটি জ্বালানীবাহী জাহাজ ইউএসএস সাইক্লপস এর উধাও হয়ে যাওয়া, ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি লোকবল হারানোর একক দূর্ঘটনা হিসেবে স্মরণীয়।

মার্চ, ১৯১৮ সালে এই বৃহৎ জাহাজটি ব্রাজিল থেকে বারমুডা ট্রায়াঙ্গল এর ভিতর দিয়ে বাল্টিমোরের দিকে যাচ্ছিলো। আর বহন করছিলো ১০৮০০ টন ম্যাংগানিজ আকরিক, সাথে ছিল প্রায় ৩০৯ জন ক্রু। খুব ভালো ও সুন্দর আবহাওয়া চলাকালীন সময়ে জাহাজ থেকে প্রেরিত শেষ সংবাদ এ বলা হয়েছিল কোন ঝামেলা ছাড়াই জাহাজটি চলছে।

কিন্তু, এরপর ঐ জাহাজ এর সাথে আর কোন যোগাযোগ করা যায়নি। পরবর্তীতে বৃহৎভাবে অনুসন্ধান চালিয়েও জাহাজটির কোন হদিস পাওয়া যায় নি। জাহাজের কোন ধ্বংসাবশেষ ও কোন ক্রু সদস্যকেও খুঁজে পাওয়া যায় নি। ইউএসএ সাইক্লপস এর ক্যাপ্টেন কখনো কোন ডিসট্রেস সিগন্যাল পাঠায় নি এবং অন্য জাহাজ থেকে পাঠানো রেডিও কলের ও কোন রেসপন্স দেয়নি ইউএসএস সাইক্লপস এর কোন ক্রু। পরবর্তীতে নৌপরিদর্শকও জাহাজটির এইভাবে উধাও হয়ে যাওয়ার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে ব্যর্থ হন।

৪. ক্যারোল এ. ডিয়ারিং

এটি ছিল ৫ মাস্তুল বিশিষ্ট বাণিজ্যিক একটি জাহাজ, যা কিনা বিংশ শতাব্দীতে সবচেয়ে বেশি লেখা হয়েছে এমন একটি সামুদ্রিক রহস্য।

জানুয়ারি ৩১, ১৯২১। Hatteras Diamond Shoals, নর্থ ক্যারোলাইনার পাথুরে বিপজ্জনক মাটিতে ক্যারোল এ. ডিয়ারিং কে পাওয়া যায়। স্মাগলিং এর সাথে জাহাজটির সম্পৃক্ততা খুঁজে পাওয়া যায়। যখন কয়েক দিন যাবৎ উত্তাল সমুদ্র পাড়ি দিয়ে অনুসন্ধানকারী দল বারবাডোজ থেকে ঘটনাস্থলে পৌঁছে, তখন তারা জাহাজটিতে ক্রু দের ব্যক্তিগত জিনিসপত্র সহ, নেভিগেশনাল যন্ত্রপাতি, লগ বুক, লাইফ রেফট দেখতে পায়, কিন্তু কোন ক্রু সেখানে ছিল না।

ক্যারোল এ. ডিয়ারিং যা কিনা ‘ ghost ship of the outer banks’ নামে পরিচিত, এই জাহাজসহ আরো কিছু জাহাজ এই বারমুডা ট্রায়াঙ্গল এর রহস্যময় স্রোতের উপস্থিতির প্রমাণ। কিন্তু কেউ এই রহস্যের সমাধান করতে পারেনি।

৫. উইচক্রাফট

ডিসেম্বর ২২, ১৯৬৭ সালে উইচক্রাফট নামক এক  কেবিন ক্রুইজার এর ক্যাপ্টেন ডেন বুরাক এবং তার বন্ধু ফাদার প্যাট্রিক হোরগান মিয়ামি থেকে যাত্রা শুরু করে। ২৩ ফুট লম্বা বিলাসবহুল ইয়টে করে তাদের ২ জনের উদ্দেশ্য ছিল ক্রিস্টমাস উপলক্ষে মিয়ামির আলোর ঝলকানি উপভোগ করা। কিন্তু তীর থেকে মাত্র ১ মাইল দূরে যেতেই কোস্টগার্ড ক্রুইজারের ক্যাপ্টেনের কাছ থেকে শুনতে পায় যে, তাদের জাহাজ কোন কিছুকে আঘাত করেছে যদিও তেমন কোন ক্ষতি হয়নি, তবুও তারা কোস্টগার্ডকে তীরের দিকে টেনে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে সাহায্য চাইছেন। কোস্টগার্ড ১৯ মিনিট এর ভেতরে ঘটনাস্থলে পৌঁছায়, কিন্তু  দেখতে পেলো না কিছুই। জাহাজটি যেই জায়গার কথা উল্লেখ করেছিল সেখানে কিছুই ছিল না। তদুপরি ইয়টটি ডুবে যাবার কোন সম্ভাবনাও ছিল না, বা সম্ভাবনা থাকলেও ইয়টে ছিল পর্যাপ্ত পরিমাণে লাইফ জ্যাকেট, লাইফ বোট, ফ্লেয়ার, ডিসট্রেস সিগন্যাল ডিভাইস। এইগুলোর কোন কিছুর উপস্থিতিও সেখানে ছিল না। পরবর্তীতে কোস্টগার্ড কর্তৃপক্ষ শত শত বর্গ মাইল পর্যন্ত অনুসন্ধান চালিয়েও ব্যর্থ হয়েছে জাহাজের কোন হদিস খুঁজে পেতে।

বাংলাকোষে লিখুন, আয় করুন... info@banglakosh.com 
বিঃদ্রঃ বাংলাকোষ কোনো সংবাদপত্র নয়, এটি মূলত একটি আর্কাইভ। বাংলাকোষ এ প্রকাশিত সকল তথ্য কপিরাইট এর অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং কোনো পূর্বানুমতি ছাড়া বাংলাকোষের কোনো তথ্য ব্যবহার করা যাবে না। তবে অব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো সূত্রসহ ব্যবহার করতে পারবে।