মোহাম্মদ কাশেম

প্রাথমিক পরিচয়ঃ

মোহাম্মদ কাশেম ছিলেন সাংবাদিক, ছোটগল্পকার, নাট্যকার, রেডিও ব্যক্তিতব ঔপন্যাসিক। সমাজের অবহেলিত ও নিপেড়িত মানুষের বন্ধু। সৃজনশীল পুস্তক প্রকাশনায় ছিল তার অন্যবদ্য অবদান। চল্লিশের দশকের সাহিত্য ও প্রকাশনার ক্ষেত্রে একটি পরিচিত নাম। রেডিওতে নাটক, কবিতা সহ বিভিন্ন ধরনের অনুষ্টান করে তিনি ঐ সময় খুবই জনপ্রিয় হন। মোহাম্মদ কাশেম যে নামটি আজ হারিয়ে যেতে বসেছে কালের শ্রোতে। বর্তমান সমাজে যে নামটি আজ রয়ে গেছে পাঠকের আড়ালে।

 

জন্ম ও বংশ পরিচয়ঃ

মোহাম্মদ কাশেম কুমিল্লা শহরে ১৯০৫ সালে পিতার কর্মস্থলে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম  সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন মায়ের নাম শাহের বান্নু খানম। তার বাবা ছিল স্কুলের শিক্ষক। তিনি ছিল একজন মৌলভী। আরবি, ফার্সিতে তিনি ছিল পণ্ডিত, তার পূর্ব পুরুষের বসতি ছিল ভারতের উত্তর প্রদেশে। পরে তিনি তৎকালীন ত্রিপুরা ( বর্তমান কুমিল্লা) এসে বসতি গড়েন। তার বাবা জীবনে দুটি বিয়ে করেন। মোহাম্মদ কাশেম ছিল তার দ্বিতীয় ঘরের সন্তান। এছাড়া ১ম ঘরে মোহাম্মদ কাশেম এর আরও চার ভাই রয়েছে। এরা হলেন মোহাম্মদ সৈয়দ, সৈয়দ ইয়াসিন, মোহাম্মদ হাসেম, মোহাম্মদ নাজেম ও মোহাম্মদ তামেজ।

 

শিক্ষা জীবনঃ

 

মোহাম্মদ কাশেমের পরিবারের সবাই ছিল শিক্ষিত। তার বাবা পড়ালেখার প্রতি ছিল খুবই আগ্রহী। তাই তার বাবা মোহাম্মদ কাশেমকে বাল্য শিক্ষা দেন। এরপর তাকে ভর্তি করেন কুমিল্লা শহরে একটি স্কুলে যেখানে তার বাবা নিজে চাকরি করেন। তার বাবার সাথে তিনি স্কুলে যান। ক্লাসের শিক্ষকরা তাকে খুবই ভালবাসতেন ও আদর করতেন কারন সে ছিল খুবই ভাল ছাত্র। কিন্তু দুঃখের বিষয় প্রবেশিকা পরীক্ষার পূর্বে তার বাবা মৃত্যুবরণ করেন। তার বাবার মৃত্যুতে তার সংসারের আসে চরম অভাবের কারনে তিনি পড়ালেখা ছেড়েদেন। এখানেই তিনি লেখাপড়ার ইতি টানেনে।

 

কর্ম জীবনঃ

মোহাম্মদ কাশেমের বাবার মৃত্যুর পর সংসারে অভাব দেখা দিলে তার মা সাহের বানু তাকে নিয়ে ঢাকায় চলে আসেন। ঢাকায় এসে মোহাম্মদ কাশেম একটি দোকানে কোন রকম বেতনে চাকরি নেন। এই বেতনে কোন মতেই সংসার চলতনা। তাই তিনি চরম দুঃখ, দারিদ্রতা নিয়ে মাত্র ১৮ বছর বয়সে ১৯২৩ সালে কলকাতায় চলে যান। সেখানে তিনি পানি খেয়ে রাস্তায় ঘুমাতেন। এরপর কিছু দিন পর তিনি পত্রিকা বিক্রি করেন। ১৯২৬ সালে তিনি আবার ঢাকায় এসে নিজেই ছোট একটি দোকান দেন। এরপর তিনি পত্রিকার সম্পাদনার সাথে জড়িত হন। এখানেও কিছু না করতে পেরে একটি ষ্টেশনারী দোকানে স্বল্প বেতনে চাকরি নেন। ১৯২৯ সালে আবার চাকরি ছেড়ে তিনি কলকাতায় চলে যান। কলকাতায় তিনি কিছুদিন হকারি করে দিন কাটান।

 

বিবাহ বন্ধন ও পারিবারিক জীবনঃ

মোহাম্মদ কাশেম ১৯২৯ সালে ঢাকার মেয়ে খাইরুল নেমাকে বিয়ে করেন। ১৯৩১ সালে মোহাম্মদ কাশেমের ও খাইরুল নেমার ঘরে আসে আব্দুল কাইউম। তখন মোহাম্মদ কাশেম ও খাইরুল নেম ছিল কলকাতায়। ১৯৩৩ সালে জন্ম নেয় ২য় সন্তান আবু তাহের। ১৯৩৬ সালে জন্ম নেয় ৩য় সন্তান হাবিবুর রহমান। ১৯৩৯ সালে যখন মোহাম্মদ কাশেম ঢাকায় চলে আসেন তখন জন্ম নেয় তার ৪র্থ সন্তান হাজেরা খাতুন। ১৯৪৫ সালে জন্ম নেয় ৫ম সন্তান জামেলা খাতুন খাইরুল নেমাকে বিয়ের পর মোহাম্মদ কাশেমের জীবনে আসে পরিবর্তন। তারা দুজনের দম্পতি জিবন ছিল সুখের। যদিও শত দরিদ্র ও তাদের জীবনে ভাঙন ধরাতে পারেনি। বরং এ দারিদ্রতার মাঝেও খাইরুল নেমা তাকে প্রেরনা দিয়েছেন বড় হওয়ার জন্য।

 

সাংবাদিক জীবনঃ

মোহাম্মদ কাশেমের কলকাতায় গিয়ে পত্রিকা বিক্রি করতেন তখন থেকে তিনি পত্রিকার প্রতি একটু আনুরাগি ছিল। কলকাতা থেকে ঢাকা ফেরার পর ১৯২৬ সালে তিনি ‘ দরিদ্র’’ পত্রিকায় চাকরি থাকা অবস্থায় তিনি নিজে ‘ অভিযান নামে একটি মাসিক পত্রিকা বের করেন। এই পত্রিকাটির নাম দেন কাজী নজরুল ইসলাম। কিছু দিন পর এটি বন্ধ হয়ে যায়। ১৯২৯ সালে তিনি কলকাতায় গিয়ে ‘ সোলতান’’ নামের একটি পত্রিকায় চাকরি নেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি কাজী নজরুল ইসলামের অতি নিকটে আসেন। সোলতান পত্রিকা বন্ধ হলে তিনি ‘ বেদুইন’ পত্রিকার সহ সম্পাদক হিসেবে যোগদেন। ১৯৩৪ সালে তিনি ‘সবুজপত্র’ নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকার সম্পাদকের ভার গ্রহণ করেন। এই সময় তিনি বিভিন্ন পত্রিকায় লেখালেখি করেন । মোহাম্মদ কাশেম এক সময় ‘ সওগাত’ পত্রিকায় জড়িত ছিলেন। পরবর্তীতে প্রকাশনা শিল্পের সাথে জড়িয়ে পড়েন।

 

সাহিত্যিক জীবনঃ

মোহাম্মদ কাশেমের সাহিত্যর ক্ষেত্রে উন্ন্যেস ঘটে যখন তিনি দরিদ্র ও অভিযান পত্রিকায় সম্পাদনায় ছিলেন। ঐ সময় তিনি দরিদ্র ও অভিযান পত্রিকায় প্রচুর লেখতেন। ১৯২৮ সালে সংগত পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ‘ মহা কবি হাসমান- বিন- সাবেত নামে একটি প্রবন্ধ। ১৯২৯ সালে প্রকাশিত হয় ‘ কবি ইমরুল কায়েসের নামে আরও একটি বিশেষ প্রবন্ধ। একই বছর ‘ মহাম্মদী পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ‘ বারোয়ারী উপন্যাস’’ নামে একটি গ্রন্থ কিস্তিতে বের হতে থাকে। এছাড়া ঐ বছর প্রথম অংশ প্রকাশিত হয় ৩য় বর্ষ সংখ্যা। ১৯৩৩ সালে বের হয় তার ২য় উপন্যাস আগামী বারে সমাপ্য। একই বছর অভিযান পত্রিকায় বের করে ‘ ধান ক্ষেত’ নামে একটি পুস্তক। ১৯৩৯ সালে বের হয় ‘ আধুনিক বাংলা সাহিত্য মুসলমান’’ ।  ১৯৪৩ সালে মোহাম্মদ কাশেম বাঙ্গালী পত্রিকায় প্রকাশ করেন ছোট গল্প ‘ পুনরাবৃত্তি’’ । ১৯৪৮ সালে আরবি কাব্যর ২য় অংশ প্রকাশিত হয় সওগাত পত্রিকায়। ১৯৪৯ সালে ‘ চিড়িয়া উড় গেয়ি’’ নামক একটি গল্প বের হয় পাকিস্থান পত্রিকায়। ‘ চকবাজারের কালুভাই’’ একটি করুন গল্প বের হয় ১৯৫১ সালের ১৪ আগস্ট পঞ্চায়েত পত্রিকায়।

 

বেতার নাটক ও অন্যান্য অনুষ্টানে মোহাম্মদ কাশেম

১৯৪০ সালে দিকে মোহাম্মদ কাশেম ওল ইন্ডিয়া রেডিও এর সাথে সম্পৃক্ত হন। ঐ সময় তিনি রেডিও ঢাকা কেন্দ্র থেকে বিভিন্ন অনুষ্টান সম্প্রচার করতেন। সংবাদ পাঠকের জন্য তিনি সংবাদ লিখে দিতেন। তিনি রেডিওতে বিভিন্ন কবিতা আবৃত্তি করতেন। নবীদের ধারাবাহিক জীবনী নিয়ে তিনি ‘ নবী কাহিনী’ নামে একটি কাহিনী লিখেন এবং টা রেডিওতে প্রচার করে তৎকালীন মুসলিম সমাজে আলোচিত ব্যক্তিতে পরিণত হয়। রেডিওতে প্রচারের জন্য তিনি ১৯৪২ সালে ‘ সোহরাব রুস্তম’’ ও ‘ মনসুর ডাকাত’ নামে দুটি নাটক লিখেন। যা পরে রেডিওতে ধারাবাহিক ভাবে প্রচার হয়। ১৯৪৭ সালে ‘ যারা কাঁদে’ নামক আরেকটি ফিচার নাটক লিখে যা পরে রেডিওতে ধারাবাহিক ভাবে প্রচার হয়। ১৯৪৮ সালে ‘ শতাব্দীর আলো’ নামে  একটি নাটক রচনা করেন এবং গ্রামোফোনে রেকর্ড করে বাজারে বিক্রি করেন।

 

প্রকাশনা শিল্পে মোহাম্মদ কাশেম

১৯৩৯ সালে মোহাম্মদ কাশেম ‘ মখদুমি লাইব্রেরী এন্ড আহসানউল্লাহ বুক হাউস এর ঢাকা শাখার ম্যনেজার নিয়োগ হন। ১৯৪৭ সালে দেশ ভঙ্গ হয়ে গেলে ‘ মখদুমি লাইব্রেরী এন্ড আহসানউল্লাহ বুক হাউস এর মালিক এটি বিক্রি করার সিধান্ত নেন। ১৯৪৮ সালে মোহাম্মদ কাশেম এটি নিজি ক্রয় করে নতুন নামে চালু করেন। তিনি এটির নাম দেন ফরাজ দিল প্রকাশ’। এরপর তিনি পুস্তক প্রকাশনায় ব্যপক সাফল্য লাভ করেন। তার প্রকাশনায় বের হয় দীনেশ চন্দ্র সেনের প্রাচিন বাংলার সাহিত্য মুসলমানদের অবদান, মুজিবুর রহমান খানের পাক ভারতের ইতিহাস সম্ভলিত ইতিহাস গ্রন্থ ‘নয়া তারিখ’’ সৈয়দ আলী আহসান রচিত Our lteritage’১৯৪৯ , মুসলিম রেনেসার কবি ফররুখ আহমেদ রচিত পাঠ্য বই ‘ নয়া জামাত’’ সহ অনেক নামকারা লেখকের বিখ্যাত বই সমূহ। ফলে প্রকাশনা শিল্পে মোহাম্মদ কাশেমের সুনাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। মোহাম্মদ কাশেমের প্রকাশনায় প্রকাশিত বিয়ের প্রচ্ছদ আঁকতেন শিল্পাচয জয়নুল আবেদীন , পটুয়া কামরুল ইসলাম সহ বিখ্যাত শিল্পীরা।

 

সামাজিক কর্মকাণ্ডঃ

মোহাম্মদ কাশেম জীবনে দারিদ্রতা কাকে বলে হারে হারে টের পান। তায় সমাজের দারিদ্রদের জন্য তার মন সর্বদায় কাঁদতেন। ১৯৪১ সালে দাঙ্গায় চরম আর্থিক সংকটে দেখা দেয়। সাধারণ মানুষ না খেয়ে মারা যেত। তাই তিনি ঐ সময় দাঙ্গা কবনিতে মানুষের সাহায্যর জন্য ‘ নওজোয়ান ক্লাব’ নামে একটি সেবা মূলক প্রতিষ্টান করেন। এই প্রতিষ্টান থেকে গরীব দুস্থ মানুষকে সাহায্য করা হত। এছাড়াও তিনি বিভিন্ন পত্রিকায় তাদের সম্পর্কে লেখে তাদের সাহায্যর জন্য সম্পদশালিদের কাছে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ১৯৪৫ সালে ২য় বিশ্ব যুব্দের সময় তিনি স্থানীয় সম্পদশালিদের নিয়ে A R P( Air Raid Precuation) নামে একটি সেচ্ছাসেবক দল গঠন করেন। ১৯৩৩ সালে মোহাম্মদ কাশেম ঢাকার রহমতগঞ্জ স্থানীয় লোকদের নিয়ে ‘’ রহমতগঞ্জ মুসলিম ফ্রেন্ডস সোসাইটি’’ (রহমতগঞ্জ ক্লাব) প্রতিষ্টান করেন। এবং এর প্রতিষ্টানকালীন সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এছাড়াও তিনি তৎকালীন সময়ে শিক্ষা সংস্কৃতি সহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অংশ গ্রহণ করে সুনাম অর্জন করেন।

 

সন্মাননা ও স্বীকৃতিঃ

মোহাম্মদ কাশেম জীবনে পেয়েছেন বহু পাঠকের শ্রদ্ধা ও ভালবাসা। তিনি কাজ করেছেন মানুষের জন্য নিজের স্বীকৃতির কথা কোন দিন চিন্তা করেনি। মোহাম্মদ কাশেম জীবনে কোন পুরষ্কার পায় কিনা জানা যায়নি।

 

মৃত্যুঃ

মোহাম্মদ কাশেম মৃত্যুর পূর্বে প্রচুর অর্থ সংকটে ভুগেন। এছাড়া ঐ সময়ে তার স্বাস্থ্যও ভাল যাচ্ছিলনা । অবশেষে ১৯৫৭ সালে ২২ শে নভেম্বর মোহাম্মদ কাশেম শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *