সীমান্তের সূক্ষ্ম যে রেখায় হিমালয়ে বেজে ওঠে যুদ্ধের দামামা (পর্ব- ১)

নিয়াজ মাহমুদ সাকিব

১৯৮৯ এর এপ্রিল ৩০, বিকেলভাগের শেষ দিকটাতে দমকা একটা ঝড়ো হাওয়া বওয়া শুরু করেছে শো শো, সঙ্গে তুষারপাতের আবহ বিরাজমান। চারিদিকে কেমন থম খাওয়া একটা সময়! বেশ প্রতিকূল। এমনই এক সময় ১১ জন যোদ্ধা/ সীমান্ত রক্ষী কাছাকাছি এসে জড়ো হচ্ছিলো।কারন সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে চার মাইলেরও বেশি উচ্চতায় থাকা অবস্থায় শ্বাস করতে তাদের বেশ কষ্ট হচ্ছে। 

প্রথম দেখাতেই তাদেরকে দেখে হয়তো মনে হতো পর্বতারোহী, যদি আর কি তাদের কাধে থাকা  স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র আর গায়ে জড়ানো সাদা ক্যামোফ্লেজকে আমলে না নেয়া হয়। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিশেষায়িত দলের চৌকস মেজর আব্দুল বিলালের দল এটা। এই দলবল নিয়েই তিনি কারাকোরাম অঞ্চলের গভীরে বড় একটা শিলার স্তূপের পেছনে আবির্ভাব ঘটালেন/ আবির্ভূত হলেন।

 

বাস্তবিক পক্ষে পর্বতারোহীরাও ওখান থেকে যে দৃশ্য দেখা যায়, তা দেখতে পারার সুযোগের জন্য বেশ ঈর্ষান্বিত হয়ে যাবে। বিশ্বের অসামান্য প্রকান্ড কিছু পর্বত ওখান  থেকে দেখা যায়।  উত্তর পশ্চিমে প্রায় ৫০ মাইল অদূরে। পৃথিবীর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ দিগন্ত জুড়ে ছেয়ে আছে। কিন্তু বরফে ছাওয়া অধিকাংশ চূড়াগুলো এখনও বেনামী পড়ে আছে, যেসব চূড়ায় এখনো কারো পা পড়েনি একবারও, শুধু মানচিত্রের স্বার্থে নাম্বারিং করা আছে চূড়াগুলো এই মর্মে যে, এগুলো আমাদের সীমানার মধ্যে। আর তাছাড়া শুধুই চূড়াগুলোর উচ্চতাকে বিবেচনা করেই আলাদা আলাদা সংখ্যায় হিসেব করা সোজা হয়েছে। 

 

২২,১৫৮। এই লেবেল থাকা একটা চূড়ায় অবস্থান নেয়ার জন্য, তাদেরকে বেশ প্রতিকূল একটা পরিস্থিতির মধ্য দিয়েই যেতে হয়। কখনো কখনো গুণতে হয় চড়া মূল্য।  আর তাছাড়া ও পর্যন্ত আরোহণের জন্য বরফের ধ্বস, ছোট বড় শিলা , এসবের মুখোমুখিও হতে হয় বেশ কয়েকবার।

চার জন তো শুধু চেষ্টা করতে গিয়েই মারা পড়েছিলো। 

 

এতোসব ঝক্কি ঝামেলার মধ্যে না গিয়ে মেজর বিলালের দলকে নামিয়ে দেয়া হয়েছিলো হেলিকপ্টারে। পাতলা বায়ুস্তর আর প্রায় জমে যাবে বরফে সব এমন আবহাওয়ায় হেলিকপ্টার আর বেশিক্ষণ দাঁড়াতে / উড়তে পারছিলো না। ফলত, এক এক করে দড়ি বেয়ে নেমে আসতে হয় মেজর বিলালের দলকে। 

 

উঁচু এ শৃঙ্গের প্রায় ১৫০০ ফুট নিচের  অবক্ষিত অবস্থাকে একটু সামলে নিতে, পুরো দল প্রায় ১ সপ্তাহের মতো দড়ি নিরূপকের কাজ করেছে আর সঙ্গে অবধারিত অনাকাঙ্ক্ষিত মুহূর্তগুলোকে মোকাবেলা করবার জন্যে উপরের বিস্তৃত ভূখণ্ডকে বেশ ভালোভাবে পরখ করে নিয়েছে।

 

তাদের কয়েকজন বলছিলেন সুরক্ষার জন্য সবাই একসাথে নিজেদেরকে দড়িতে বেঁধে নেয়াই ভালো।

কিন্তু বাঁধ সাধলেন বিলাল। তিনি বললেন, “আমাদের একজনের গায়েও যদি কোনো কিছুর আঘাত লাগে, একসাথে সব মারা পড়বো। কোনো দড়ির প্রয়োজন নেই, সবাই ক্র্যাম্পন (স্ক্রুওয়ালা লৌহ সাঁড়াশি যুক্ত জুতা)  পড়ে নিন। তারা শেষবারের মতো একবার চেক করে নিলো যে, তাদের অস্ত্রের যে অংশগুলো নড়াচাড়ার দরকার পড়তে পারে সেগুলো জমে গেছে কিনা। এবং তারপর!

 

 ঠিক সন্ধ্যা হবার আগে, ভয়ংকর মোচড়ানো বাতাস বইছে পেছন থেকে। এমন সময়,বিলাল তার দলবলকে নেতৃত্ব দিয়ে খাড়া পাহাড়ের শৈলশ্রেণীতে জমাটবদ্ধ তুষারপুঞ্জ বেয়ে পাশের চূড়ায় উঠে আসেন। 

 

হঠাৎ, দুজন ভারতীয় প্রহরীর  রোদে পোড়া, অন্ধকার মুখগুলো একটা অস্থায়ী পর্যবেক্ষণ পোস্টের দেয়ালে সেঁটে যাওয়া বরফের দেয়ালের আড়াল থেকে ভেসে আসলো। বিলাল শুদ্ধ উর্দুতে তাদেরকে জানালেন, “ আপনারা এখন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কব্জায়! আপনাদেরকে চারদিক থেকে পাকিস্তান আর্মি ঘিরে ফেলেছে। অস্ত্র ফেলে দিন।”

 

ভারতীয় এই দুজন সেনানী এবার বরফের প্রাচীরের আড়াল থেকে ধীরে ধীরে নেমে আসলেন। 

 

বিলাল আরো বলছিলেন, “ ভারতীয়দের সেনাবাহিনী আপনাদেরকে এখানে পাঠিয়েছেই মৃত্যুবরণ করবার জন্য!” তারপর তিনি শুনলেন স্বতন্ত্র খাড়া এ কে- ৪৭ এর ডাবল ক্লিকের আলাদা করতে পারার মতো ভেসে আসা শব্দ। 

 

“আমরা স্বেচ্ছাচারী ছিলাম না, উচ্ছৃঙ্খল খুনী ছিলাম না”, রাওয়ালপিন্ডিতে প্রায় তিন দশক আগের ঘটে যাওয়া ঘটনার স্মৃতিরোমন্থন করতে করতে বলছিলেন বিলাল। “আমরা শুধুই চেয়েছিলাম আমাদের নিজেদের অঞ্চলের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে।  এবং আমরা যেকোনো মূল্যেই রক্ষা করতাম আমাদের মূলক, আমাদের দেশপ্রেমের ধর্তব্য এটা।” সে একপ্রকার মোটামুটি নিশ্চিত ছিল ভারতীয়রাই প্রথম আঘাত হেনেছিলো। বিলাল এবং তার দলের লোকেরা ভারতীয়দের গুলিবর্ষণের পরেই তাদেরকেও গুলি ফেরত দিয়েছে। 

 

 ছোড়া গুলিগুলো ভারী তুষার আর পাতলা বাতাসের স্যাঁতস্যাঁতে ভাবে আরো তীক্ষ্ণ হলো এবং সাথে সাথে লুটিয়ে পড়লো  একজন ভারতীয়। 

 

পাকিস্তানিরা গুলি চালানো বন্ধ করে দিলো এবং বিলাল দ্বিতীয় ভারতীয়কে হাঁক ছাড়লেন, “এখান থেকে চলে যান… আমরা আপনাদের বন্দী করে নিয়ে যেতে চাইনা এবং আমরা আপনাদের পেছন থেকে গুলিও করবো না, ভয় নেই! আপনারা চলে যেতে পারেন।” 

 

ভারতীয় সে সৈন্য উঠে দাঁড়ালেন এবং কুয়াশায় হারিয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত বিলালের দৃষ্টিপানে শুধুই ধরা পড়লো ভারতীয় এক সৈন্যের খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ফিরে চলা আর প্রাণ সংশয়ে দৌড়িয়ে হাঁপিয়ে ওঠা ওষ্ঠাগত এক প্রাণ।

 

ভারত আর পাকিস্তান ছাড়া বাইরের খুব কম মানুষই এ ঘটনা সম্পর্কে জানতো। আর তাছাড়া ২২,১৫৮ ফুট উঁচুতে ঘটা এই ঘটনা রীতিমতো ভীতিসঞ্চারিও বটে এবং একই সাথে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে কারন এটাই এ পর্যন্ত বিশ্বের সর্বোচ্চ উচ্চতায় ঘটা স্থলযুদ্ধ।

 

কোনো এক পাহাড়ী ব্লু-বারড ডাকা ভোরে, ঠিক ২৮ বছর পরে আমি আর আলোকচিত্রী কোরি রিচারডস সেই লড়াইয়ের ঘটনাস্থল থেকে কয়েক মাইল দূরে অনেকটা বাধ্য হয়েই বেশ ঝঞ্ঝাট সামলে তুষারঢাকা সেই হেলিপ্যাডের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। 

 

পেশাদার পর্বতারোহীদের মতোই , আমরা উভয়েই কারাকোরামের শিখরে আরোহণ করেছি এবং তখন এটা খুব ভালোভাবেই উপলব্ধি করছিলাম যে, কি পরিমাণ আপ্রাণ প্রচেষ্টা আর দক্ষতার প্রয়োজন হয় শুধুমাত্র কোনোমতে টিকে থাকতে এখানে। 

 

তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ভারত ও পাকিস্তান তাদের একেবারেই তরুণ সৈন্যদেরকে কঠোর-নির্মম এই পরিবেশে  পাঠাচ্ছে, যেখানে তারা নূন্যতম এক মাস , কখনো কখনো কয়েক মাস অবধি থাকে। প্রত্যন্ত আর জনশূন্য প্রান্তর পাহারা দেয়। জন্মভূমির সুরক্ষা নিশ্চিত করে।

 

স্মারক বরফখন্ডগুলো যে ভূচিত্রে আধিপত্য করে, সেই ভূচিত্রই মূলত পাকিস্তান, ভারত এবং চীনের বিতর্কিত সীমান্তের মিলনস্থলের প্রতিনিধিত্ব করে। আর পর্যবেক্ষকরা ঠিক এই বিতর্কিত সীমান্ত মিলনস্থলের ভূবিন্যস্ত অঞ্চল নিয়ে উদ্ভূত দ্বন্দ্বকেই “সিয়াচেন হিমবাহ সংঘাত” বলে অভিহিত করে থাকেন। 

 

সেই ১৯৮৪ থেকেই তো এদের উভয় পক্ষের শত শত নয় হাজার হাজার লোক হতাহত হয়েছে। ২০০৩ সালে যদিও যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিলো উভয় পক্ষ কিন্তু তাতে কি! প্রতিনিয়তই বছর বছর মানুষ মরছে এখানে। না, না, যুদ্ধে নয়! 

 

ভূমিধ্বস, হিমবাহ, হেলিকপ্টার ক্র্যাশ, অতি উচ্চতায় টিকতে না পারা, অসুস্থতা, রক্তজমাট বেঁধে পঙ্গু হয়ে যাওয়া, এরকম অন্যান্য আরো অনেক কারন। এতোকিছুর পরেও , প্রতিবছর ভারতীয় এবং পাকিস্তানি তথা দুই দেশের সৈন্যরাই এখানে দেশকে সার্ভিস দেওয়ার জন্যই পাগলপ্রায় হয়ে থাকে। 

পাকিস্তানি একজন কর্মকর্তা আমাকে জানিয়েছেন যে, এখানে দায়িত্ব পালন করে দেশকে সার্ভিস দেওয়া পরম সম্মানের ও গৌরবের। 

 

পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা, তাকের পর তাক বই, খবর, পত্রিকার নিবন্ধ এবং এমনকি অসংখ্য গবেষণা নিবন্ধও লেখা হয়েছে এই অঞ্চলের সংঘাতগুলোকে কেন্দ্র করে, বিশেষ করে এইরকম সম্পূর্ণই একটা বেফায়দার অঞ্চলকে নিয়ে যে যুদ্ধ হতে পারে এটাই কিছু কিছু গবেষক ও বিশ্লেষকদের কাছে অদ্ভুত ঠেকেছে আর সেসব যুদ্ধের বালখিল্যতা নিয়েও সমালোচনামুখর ছিলেন বেশ অনেকেই।

 

একদমই স্বাভাবিকভাবে বলতে চাইলে ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের বিশেষজ্ঞ স্টিফেন পি কোহেনের ভাষায় বলতে হয়, ঘৃণায় অন্ধ বনে যাওয়া  দুজন জেদী শত্রু কেউ কাউকে ছেড়ে কথা বলবে না,  একজন আরেকজনকে মোকাবেলা করতে সবকিছুরই একদম চূড়ান্ত সীমা পর্যন্ত যাবে এবং এই স্টিফেন কোহেনের মতেই “সিয়াচেন বিরোধটা” অনেকটাই দুজন টাক মাথার মানুষের একটা চিরুনি নিয়ে যুদ্ধের মতো। 

তবে ঠিক কি পরিস্থিতি দুই টাকুকে লড়াই করতে উদ্বুদ্ধ করেছিলো এবং প্রত্যেক বারই উস্কে দেয় ,তা কখনোই পুরোপুরি সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয়নি! 

 

সিয়াচেন বিরোধকাব্যের একটি অস্পষ্ট অথচ গুরুত্বপূর্ণ রহস্য উন্মোচনের উদ্দেশ্যে  আমি সম্প্রতি উন্মুক্ত করে দেওয়া সবগুলো নথিতে ঝা মেরেছি, আর তাছাড়া ভারত,পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের নানা কর্মকর্তা, পণ্ডিত, গবেষক ও সেনা কর্মকর্তাদের সাক্ষাৎকার নিতে নিতে নিজের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ চারটা বছর অতিবাহিত করে দিলাম। 

আর এখন কোরি এবং আমি আসলাম পাকিস্তানে ঠিক কি পরিণতি হতে পারে মানচিত্রে (সংঘাতের কারন খুঁজে বেড় করতে কিংবা সংশ্লিষ্ট অন্য সবকিছু ভালোভাবে বোঝার স্বার্থে)  একটা সূক্ষ্ম রেখা টেনে দিলে তা সরেজমিনে প্রত্যক্ষ করার জন্য। একেবারে নিজেদের চোখ দিয়ে পরখ করে যাবার জন্য। নতুন কিছু যদি পাওয়া যায় আর কি!

 

(যেহেতু ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের মূল নিবন্ধ অবলম্বনে রচিত লেখা এটা, সেহেতু এই লেখার সমস্ত দায় সংশ্লিষ্ট মিডিয়া প্রতিষ্ঠানের এবং বাংলাকোষ এ দায় নেবেনা)

বাংলাকোষে লিখুন, আয় করুন... info@banglakosh.com 
বিঃদ্রঃ বাংলাকোষ কোনো সংবাদপত্র নয়, এটি মূলত একটি আর্কাইভ। বাংলাকোষ এ প্রকাশিত সকল তথ্য কপিরাইট এর অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং কোনো পূর্বানুমতি ছাড়া বাংলাকোষের কোনো তথ্য ব্যবহার করা যাবে না। তবে অব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো সূত্রসহ ব্যবহার করতে পারবে।