আমাদের কান্না করার সময় কেন অশ্রু বের হয়?

Photo: Helpguide

তৌফিক মাহমুদ ভুঁইয়া: আমাদের কান্না করা অথবা অশ্রু বের হবার পেছনে রয়েছে তিনটি কারণ।

প্রথমত, আমাদের চোখকে সুস্থ রাখতে অশ্রুর প্রয়োজন রয়েছে। সত্যিকার অর্থে প্রতিনিয়ত ই আমাদের চোখ হতে অল্প অল্প করে অশ্রু বের হচ্ছে চোখকে সিক্ত রাখার প্রয়োজনে।

কিন্তু অশ্রু চোখ থেকে ঠিক তখনই গড়িয়ে পড়া শুরু করে, যখন আমরা বেশি আবেগঘন হয়ে পড়ি- সেটা হতে পারে কোন কষ্টের কারণে অথবা খুশির জন্যে।

অথবা যখন আমাদের চোখে ধূলা পড়ে বা আমরা পেঁয়াজ কাটতে যাই, তখন চোখে যে অস্বস্তি বোধ করি, তার ফলেও অশ্রু গড়িয়ে পড়ে।

আমাদের চোখের কর্মক্ষমতা ঠিক রাখতে অশ্রু প্রয়োজন। চোখের রয়েছে বিশেষ কিছু অংশ- একটি হচ্ছে গ্ল্যান্ডস বা গ্রন্থি, তা কিনা প্রতিনিয়ত অশ্রু উৎপাদন করে চলেছে। সাধারণত এই গ্রন্থিগুলো একদিনে অর্ধ চামচ অপেক্ষাও কম অশ্রু উৎপন্ন করে থাকে। অশ্রু এর অধিকাংশ উপাদান ই হচ্ছে পানি ও রয়েছে কিছু পরিমাণ লবণ। এছাড়াও রয়েছে অল্প পরিমাণে কিছু তেল জাতীয় পদার্থ, মিউকাস এবং জীবাণু ধ্বংসকারী এনজাইম। তেল জাতীয় পদার্থের এই অল্প পরিমাণে উপস্থিতিই চোখের অশ্রু শুকিয়ে যাওয়া ও ঝরে পড়া থেকে রক্ষা করে। অন্যথায় আমরা চোখে শুষ্কতা ও ব্যাথা অনুভব করতাম।

আমরা যখন পলক ফেলি, তখন চোখের পাতা উৎপন্ন হওয়া অশ্রুকে সুষমভাবে পুরো অক্ষিগোলকে ছড়িয়ে দেয় আর মিউকাস আঠার মতো এই অশ্রুকে লেগে থাকতে সাহায্য করে। আর অতিরিক্ত অশ্রু বিশেষ ড্রেনেজ বা নিষ্কাশন ব্যবস্থায় আমাদের নাকে চলে আসে।

আর আমারা যখন কান্না করি- আশা করি তুমি খুব বেশি কান্না কাটি করো না- তখন আমরা চোখের ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি পরিমাণে অশ্রু উৎপন্ন করি। কারণ চোখের বড় বড় নিঃসারক গ্রন্থিগুলো তখন চালু হয়ে একবারেই প্রচুর পরিমাণে অশ্রু উৎপন্ন করে, ঠিন ছোট ফোয়ারার মতো।

 

আমাদের মস্তিষ্কের যে অংশ এই ‘অশ্রুর ফোয়ারা’ কে চালু করে, সেটি আবার মস্তিষ্কের আবেগ নিয়ন্ত্রণকারী অংশ থেকে সংকেত গ্রহণ করে।

আর যখন এমনটা ঘটা শুরু হয়, চোখ তখন কয়েক মিনিটেই এক কাপের অর্ধেক এর চেয়েও বেশি পরিমাণে অশ্রু উৎপন্ন করে। আর এই অশ্রুর পরিমাণ চোখের ধারণক্ষমতা ও নিষ্কাশন ব্যবস্থার সক্ষমতার চেয়েও বেশি হয়ে পড়ে। তোমার নিশ্চয়ই মনে আছে নিষ্কাশন ব্যবস্থায় অতিরিক্ত অশ্রু নাক দিয়ে ঝরে পড়ার কথা। আর এর ফলেই যখন তুমি কান্না কর, তখন নাক দিয়েও পানি ঝরা শুরু হয়, যার উৎস চোখ হতে উৎপন্ন এই অতিরিক্ত অশ্রুই।

কেউ যখন অনেক বেশি কাঁদে, তখন এই নিষ্কাশন ব্যবস্থার চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে অশ্রু উৎপন্ন হওয়ায়, অশ্রু চোখ থেকে গড়িয়ে পড়া শুরু করে।

সাইকোলজিস্টদের মতে মানুষ ই একমাত্র প্রাণী যারা আবেগের কারণে কান্না করতে পারে। আমাদের অধিকাংশ দুঃখের বা কষ্টের কারণে কান্না করে থাকি। আবার কেউ কেউ খুশিতেও কেঁদে ফেলি।

আমরা আসলে জানি না, ঠিক কি কারণে আবেগঘন হয়ে পড়লে আমরা কান্না করি। কিন্তু আমরা সাধারণ অশ্রু ও আবেগ থেকে উৎপন্ন হওয়া অশ্রুর রাসায়নিক গঠনে পার্থক্য খুঁজে পাই। কিছু বিজ্ঞানী বিশ্বাস করেন, এই ভিন্ন রাসায়নিক উপাদানগুলোই কান্নার পর আমাদের ভালো অনুভূতির সৃষ্টি করে থাকে।

আরো কিছু অদ্ভূত কারণ রয়েছে কান্না করার পিছনে। কিছু মানুষ আছে যাদের খাবার খাওয়ার সময় অথবা খাবার নিয়ে চিন্তার সময় অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। এটাকে বলা হয় ‘ crocodile tears syndrom’ এমনটা নামকরণ হয়েছে, কেননা লোককথায় রয়েছে কুমির তার শিকারকে কাছে আনতে কান্নার অভিনয় করে থাকে।

‘Crocodile tears syndrom’ ঘটতে পারে কেউ কোন দূর্ঘটনার শিকার হয়ে থাকলে অথবা মুখের কোন হাড় ভেঙে গেলে। মুখ হয়তো স্বাভাবিক ভাবে তার ক্ষত সারিয়ে তোলে। কিন্তু এর সাথে সংযুক্ত স্নায়ুগুলো ভুলভাবে সেরে উঠা শুরু করে। যে স্নায়ু খাবার দেখলে বা ঘ্রাণ শুঁকলে মুখে লালার সৃষ্টি করে, তখন সেই স্নায়ুর জায়গায় ভুলক্রমে অশ্রু নিঃসারক গ্রন্থির সংযুক্তি ঘটে। এর ফলে পরবর্তীতে ঐ ব্যক্তি সুস্বাদু কোন খাবারের দর্শন ও গন্ধ পেলে, তার চোখ কান্না করা শুরু করে দেয়।

বিঃদ্রঃ বাংলাকোষ কোনো সংবাদপত্র নয়, এটি মূলত একটি আর্কাইভ। বাংলাকোষ এ প্রকাশিত সকল তথ্য কপিরাইট এর অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং কোনো পূর্বানুমতি ছাড়া বাংলাকোষের কোনো তথ্য ব্যবহার করা যাবে না। তবে অব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো সূত্রসহ ব্যবহার করতে পারবে।