বাংলাদেশী মানব মাংশাসী খলীলুল্লাহ ও নূরজাহানের অমর প্রেমের উপাখ্যান

নিয়াজ মাহমুদ সাকিবঃ শৈশবের বন্ধু রবি-ডোম, আর লালবাগের খলিলুল্লাহ ওরফে খইল্লা পাগলা মিলে যেকোনো পর্দার সাইকো থ্রিলারকে হার মানাতে পারে এমন কোনো ন্যারেটিভেরই বাস্তব রচয়িতা হতে যাচ্ছে,তা কে কবে ভেবেছিলো আগে! তাও আবার বাংলাদেশের মতো জায়গায়!

পুরো ৭৫ টাই যেন ছিল অভিশপ্ত! এই ১৯৭৫ সালের এপ্রিলের ৩ তারিখ, তৎকালীন দৈনিক, “দৈনিক বাংলা” প্রথম প্রতিবেদন ছাপায় এই খইল্লা পাগলাকে নিয়ে! যে প্রতিবেদনের ফিচার ইমেজে দেখা যাচ্ছিলো, টগবগে এক মধ্যবয়সসী যুবক একটা লাশের কাটাছেড়া করা দেহ থেকে কলিজা বের করে খাচ্ছে। এক শহর , দুই শহর নয়, পুরো দেশজুড়েই এই প্রলয়কান্ড নিয়ে হই হই রই রই মতো অবস্থা! কর্তৃপক্ষকে স্বাভাবিকভাবেই বিড়ম্বনায় ফেলে দেবার মতো এক ঘটনা! দুই দিনের মধ্যে সব একদম নড়েচড়ে বসেছে। মানুষকে মুহূর্তের মধ্যে অদ্ভূত রকমের শিহরণ জাগানো এই ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই জনসাধারণের মাঝে বেশ সাড়া ফেলেছে। তার ফলশ্রুতিতে একে একে বের হয়ে আসে খলিলুল্লাহকে নিয়ে নতুন নতুন সব গল্প! আর গণমাধ্যমগুলোও একে একে কভার করতে থাকে সবগুলো স্টোরি! কেউ কেউ তো কভার ইমেজও দিয়ে দিয়েছিলো।

এই পৈশাচিক খাদ্যাভ্যাস আর এই খাদ্যাভ্যাসের প্রতি প্রেমের শুরুটা ঠিক কীভাবে হয়েছিলো সে ব্যাপারে স্পষ্ট কিছু জানা না গেলেও, এতোটুকু জানা যায় যে,খলীলুল্লাহর শৈশবের বন্ধু রবি ডোমের বাবা ছিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের প্রথম দিককার ডোমদের একজন! আর তার সুবাদেই তাদের এত বাড় বাড়া! যতোদূর জানা গেছে যে, একটা নির্দিষ্ট সময় পরে রবি ডোম যেকোনো প্রভাবের কারনেই হোক কিংবা অন্য যেকোনো কারনে, মরা মানুষের মাংস খাওয়া ছেড়ে দিতে সক্ষম হয়েছিলো! পিছনে রয়ে যায় খইল্লা পাগলা! তার আর ভালো হয়ে ওঠা হয়ে ওঠে না!

আর এই ঢাকা মেডিকেল ছাড়াও মিটফোর্ড হাসপাতালেও সোনা ডোম আর গোপাল ডোম তাদেরকে এই সুযোগ করে দিয়েছিলো! কল্পনাতীত নয় কি! যে, ঢাকা মেডিকেলের মতো প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর কিংবা রোগীদের বিষাদমাখা অসুস্থ অবয়ব আর রোগীর স্বজনদের প্রতিনিয়ত আহাজারি, এসবের মধ্যেও মরা মানুষের মাংস খাওয়ার মতো ঘটনাগুলো ঘটছে!

কিন্তু জানেন! এই খইল্লা পাগলাও একটা সময় ভালো হয়ে যায়! তার মাঝেও পরিবর্তন আসে! সে ও ধীরে ধীরে একজন মানুষ হয়ে ওঠে!সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানায়, পুলিশি হেফাজতে তাকে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞদের সংস্পর্শে রাখার পরে বিশেষজ্ঞদের আন্তরিক চেষ্টায় ধীরে ধীরে সেড়ে উঠতে থাকে খইল্লা পাগলা। একটা সময় তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়!

জীবনের সকল আশা নিরাশা… সবকিছু শেষ! তার জীবনের অনেকটা সময় চলে গেলেও হাল ছাড়েন নি ! খুঁজেছেন কাজ! মেলেনি কিছুই! কেউই তাকে ভালোভাবে গ্রহণ করতে রাজী হয়নি! কিন্তু ছেড়ে যায়নি কবরস্থানের ওই ভিক্ষুকেরা! পাশে টেনে নিয়েছেন!

 

হয়তো ওই ভিক্ষুকদের সাথে একাকার হয়ে একই সারিতে বসে খলিলুল্লাহ হয়তো ভাবছিলেন, এই নিয়তিই বোধ হয় তার পূর্বের সব কৃতকর্মের প্রায়শ্চিত্ত অথবা নতুন এক জীবন! যে জীবন আশীর্বাদের, যে জীবন পরিবর্তনের,যে জীবন উপভোগের, যে জীবন নিষ্কলুষ, যে জীবন নিয়তির।

ওই ভিক্ষুকদের মধ্যেই এক ভিক্ষুক, নাম নূরজাহান বেগম! প্রেমে পড়ে যায় খলিলুল্লাহ! বিয়ে করে ফেলে ভিক্ষুক নূরজাহানকে! আর এই নূরজাহানই হয়ে ওঠে তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ! হয়তো এই নূরজাহানই আলোর দিশারী! এই নূরজাহানই ঈশ্বরের আশীর্বাদ! প্রেমের মায়াজালের বুননে আটকা পড়ে যায় খলীলুল্লাহ ! আর চুপচাপ, মিষ্টিভাষী ভুল পরিবেশ আর অযত্নে বেড়ে ওঠা এক পাগল যিনি সঠিক পরিচর্যায় হয়তো কোনো এক হারিয়ে যাওয়া দার্শনিক  হয়েও উঠতে পারতেন, তেমনি এক সাইকো খলিলুল্লাহকে ২০০৫ এ হারিয়েছে বাংলাদেশ ! যেকোনো সাইকো থ্রিলারের প্রোটাগনিস্টকে হার মানানো প্রধান চরিত্র খলিলুল্লাহর জীবন পরিবর্তনের এক উজ্জ্বল ভাস্মর দৃষ্টান্ত হয়েই থাকলো!

জানা যায়, বিয়ের পরের খলিলুল্লাহ নাকি একেবারেই নতুন এক খলিলুল্লাহ! মানুষ নানাভাবে বিদ্রূপ করলেও চুপ করে সব মাথা পেতে সহ্য করে গেছেন!

জীবনের একেবারেই অন্তিম সময় পার করেছেন আজিমপুর গোরস্থানের আশেপাশে! শুধু গেটের একটু ওপাশে মূল গোরস্থানে কখনোই আর ঢোকেননি তিনি! দুই ছেলে জন্মেছে নূরজাহানের গর্ভে! এক ছেলে প্রচন্ড জ্বরে কাবু হয়ে শেষ দিন গুনছিলো যখন, তখন বাবা খলিলুল্লাহ তাকে প্রচন্ড যত্নে নিজের কোলের উপরে রেখে সারারাত হাউমাউ করে কেঁদেছেন! কে বিশ্বাস করবে তাদের বাবা মানব মাংশাসী পিশাচ ছিল কোনো এক কালে! ইংরেজী ২০০৫ সাল! পুরো হাত পা শরীর পানিতে ফুলে ওঠে !কালের গর্ভে হারিয়ে যায় খলিলুল্লাহ! এক কালে কবরস্থান থেকে লাশ তুলে লাশের মাংস খাওয়া খলিলুল্লাহ আজ নিজেই কবরে শায়িত হলেন!

নূরজাহান এখন বৃদ্ধ! নিজেকে বাঁচিয়ে নিতে পারতেন হয়তো! কিন্তু কে জানে বিধাতার কি স্বর্গীয় উপহার প্রেম! নূরজাহান ও মানব মাংশাসী খলিলুল্লাহর প্রেমকে অগ্রাহ্য করতে পারেন নি! নিজেকে কখনো খইল্লা পাগলার বউ বলে পরিচয় দিতে পারেন নি! তবে খইল্লা পাগলার শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত পাশে ছিলেন নূরজাহান! তাদের প্রেম ও কি অমর কোনো প্রেমগাঁথা হিসেবে কাব্যগ্রন্থগুলোর পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা ভরা কবিতায় স্থান পেতে পারেনা?

বিঃদ্রঃ বাংলাকোষ কোনো সংবাদপত্র নয়, এটি মূলত একটি আর্কাইভ। বাংলাকোষ এ প্রকাশিত সকল তথ্য কপিরাইট এর অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং কোনো পূর্বানুমতি ছাড়া বাংলাকোষের কোনো তথ্য ব্যবহার করা যাবে না। তবে অব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো সূত্রসহ ব্যবহার করতে পারবে।