অনলাইন এডুকেশনঃ অভিশাপ না আশীর্বাদ ?

Photo: sarkariguruji.in

বাংলাকোষ ডেস্কঃ হ্যাঁ, বলছিলাম , অনলাইন কোর্সগুলোর কথা। অফলাইন অনেক প্রতিষ্ঠানই এখন অনলাইন পারফরম্যান্স বিচার করে আপনাকে সার্টিফিকেট ও দিচ্ছে। যা বলা চলে স্বীকৃতি। এখন আপনি ঘরে বসেই পড়তে পারছেন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে , অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, অধিকাংশই নন ক্রেডিট কোর্স! তবে শেখার আগ্রহ থাকলে নন ক্রেডিট আর ক্রেডিট এর কি আছে! তবে অনেকেই হয়তো জানেন না যে, ক্রেডিট কোর্স ও আছে, কিন্তু সেক্ষেত্রে স্কলারশিপ পাওয়াটা একটু মুশকিল হয়ে ওঠে। যেমন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট থেকেই আপনি ব্যাচেলরের ক্রেডিট কোর্সগুলো করে নিতে পারবেন! তবে সেক্ষেত্রে আপনাকে গুণতে হতে পারে ডলার।

এখন পর্যন্ত অনলাইনে সবথেকে জনপ্রিয়, দুঃখিত, এখন আর বলা যাবেনা সবথেকে জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম কোনটা। কারন এখন বেশ কিছু অনলাইন প্রতিষ্ঠানই অনেকে জনপ্রিয়। অনলাইনে এখন একাডেমীই আছে প্রায় শ খানেক।

হ্যা , এবার প্রথম একাডেমীর কথাই বলবো। খান একাডেমী নামে যেই একাডেমী শুরু হয়েছিল, তা তো কম বেশি আমরা সবাই ই জানি! কিন্তু খান একাডেমীর কাজ ছিল অনেকটা প্রাইভেট টিউটরের মতো। যাকে বলা চলে নিজের প্রতিষ্ঠান, নিজেই সবকিছু শিখে নিচ্ছেন, তবে খান একাডেমী শুধুই একাডেমীক বিষয়গুলো নিয়েই নড়াচড়া করতো। অনেকটা মূল পড়াশোনার বাইরে আপনার প্রাইভেট টিচারের মতো।

 

কিন্তু বলবো এক ব্যতিক্রমী একাডেমীর কথা। নাম । সেইলর একাডেমী! এটাকে একটা ছোটোখাটো কলেজ বলা যায়। আমেরিকান এডুকেশন কাউন্সিলের অধীনে কাজ করে এই অনলাইন প্রতিষ্ঠানটি। আপনি প্রায় সবরকম অ্যাকাডেমিক কোর্সগুলো পাবেন এখানে, ফ্রি ! তবে আপনি চাইলে প্রোক্টরড এক্সাম ও দিতে পারেন। এতে প্রোক্টরের জন্য আপনার খরচ হবে ২৫ ডলার। কিন্তু অন্য কোন খরচ নেই। আর আমেরিকান এডুকেশন কাউন্সিলের সার্টিফিকেট ৮০ শতাংশ নাম্বার পেলেই পাবেন। তবে লেখা থাকবে আনপ্রোক্টরড। অর্থাৎ নীতি বহির্ভূত সহযোগিতার সুযোগ নেয়ার সম্ভাবনা থেকে যেতে পারে। তাই প্রোক্টরড এক্সাম নেয়াই ভালো নয় কি!

বর্তমানে সবথেকে জনপ্রিয় অনলাইন কোর্স এর সাইট হচ্ছে কোর্সেরা। যেখানে আপনার জাতীয় পরিচয়পত্র এবং আর্থিক সামর্থ্য বিবেচনায় বৃত্তিও দেয়া হতে পারে।অক্সফোর্ড, হার্ভার্ড, এম আই টি, অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির মতো বিশ্বের নামকরা সব বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও এই প্ল্যাটফরমে আছে। তবে সুসংবাদ হলো, এই কোভিড-১৯ এর সময়ে কোর্সেরা ইন্সটিটিউট ভিত্তিক বৃত্তি কিংবা পেইড কিংবা ফ্রি কোর্সের সুযোগ দিয়েছে এবং বাংলাদেশ থেকে জানা যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইউনিভার্সিটি অফ গ্লোবাল ভিলেজ এ যাত্রায় অংশ হয়েছিলো!

আরেকটা আছে এড এক্স, যেখানে দুনিয়ার তাবৎ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ক্লাস নেয়। সবার জন্য উন্মুক্ত শিক্ষাব্যবস্থা, তবে সারটিফাইড হতে টাকা দেয়া লাগে, আর ওই টাকা দিয়েই ওদের সব কার্যক্রম চলে। শুরুর পর থেকে ওদের অর্থায়নের জন্য আলাদা কোন ব্যবস্থা নাই। আবার এড এক্সের আছে বেশ কিছু পিয়ারসন সেন্টার। আমাদের বাংলাদেশেও আছে। প্রায় দশটা পিয়ারসন সেন্টার। সবকিছু অনেকটা কোর্সেরার মতোই। তবে এড এক্স কোন স্কলারশিপ দেয়না এখন পর্যন্ত । কিন্তু এড এক্সের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যেটা আমি আপনি সবাই বিবেচনা করতে পারি তা হলো মাইক্রোমাস্টারস, আপনি এই এডএক্স সাইট থেকেই করতে পারেন মাইক্রোমাস্টারস, অস্ট্রেলিয়ার কুইন্স ইউনিভার্সিটি সহ বিশ্বের নামজাদা সব বিশ্ববিদ্যালয়ের। আর মাইক্রোমাস্টারসের পরীক্ষাগুলো কোরসের পরীক্ষার মতো না, এক্ষেত্রে আপনাকে অবশ্যই যেকোনো একটা পিয়ারসন সেন্টারে গিয়ে পরীক্ষা দিতে হবে। আর আপনাকে ওরা মাইক্রোমাস্টারসের ডিগ্রীটা দেয়ার সাথে সাথে ওদের ক্যাম্পাসগুলোতে মাস্টার্সের কোর্স আর সময় বিবেচনায় অন ক্যাম্পাস পড়ার সুযোগও দিবে, তবে রেজাল্টের ভিত্তিতে। অবশ্যই ভালো ফলাফলকারীরা অগ্রাধিকার পাবে।

যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করতে গিয়েই এই এম্বাসি ওই এম্বাসি দৌড়াই আমরা, সেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে এমনিতেই চান্স পেয়ে যাওয়া আসলেই অনেকটা কল্পনাতেও স্বপ্ন মনে হয়। তবে প্রোফেশনাল দক্ষতা বাড়াতে গেলে লিংকড ইন লারনিং এর কোন বিকল্প নেই, বর্তমানে আরো আছে সেন্টার অফ এক্সিলেন্স, ইউডেমী ইত্যাদি, যেখানে যে কেউ শিক্ষক হতে পারে। ইউডেমী অল্প কয়েকদিনেই বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। লিংকড ইন এর ই আরেকটা ওয়েবসাইট আছে নাম লিনডা. কম। তবে সব জায়গায় সব কিছু ফ্রি আশা করাটাও বোকামি! চাইলেই আপনি দেখতে পারেন কোর্সগুলো। কোনো কোনোটা ডিপ্লোমা , হায়্যার ডিপ্লোমা ও দেয়। অনেকেই বলে এগুলো মূল্যহীন। আরে ভাই, করেই দেখেন না! আপনি তো আর সবকিছু শুধু সার্টিফিকেটের জন্য করছেন না! আপনি এসব কিছুর সাথে একটু পরিচিত থাকলে কিভাবে কিভাবে যে নিজেকে অন্যদের চাইতে একটু আলাদা , একটু উচুতে নিয়ে যেতে পারবেন , টেরও পাবেন না।

আমরা হয়তো অনেকেই জানিনা, অনলাইনেই আছে একটা বিশ্ববিদ্যালয়। যার নাম ইসলামিক অনলাইন বিশ্ববিদ্যালয়। এই বিশ্ববিদ্যালয় আপনাকে দেবে ফ্রি তেই সাধারণ ডিপ্লোমা, যেখানে প্রতিটি কোর্সে পাশ করতে লাগে ন্যূনতম আশি নাম্বার। আর এরকম মোট চব্বিশ থেকে ছত্রিশটি কোর্স পাশ করতে হয় এই ডিপ্লোমা পেতে। অবাক করার বিষয় হলো এই বিশ্ববিদ্যালয় ব্যাচেলরের সাথে সাথে মাস্টার্স ডিগ্রীও দেয়। এবং এখন পি এইচ ডি কার্যক্রম ও হাতে নেবার কথা ভাবছে। দুঃখজনক ব্যাপার হলো, ফ্রিতে সাধারণ ডিপ্লোমার সুযোগটা ২০১৯ এ এসে ইসলামিক অনলাইন ইউনিভার্সিটি বন্ধ করে দিয়েছে। ইসলামিক ইকোনোমি, ইসলামিক বিবিএ, একটু বেশিই ভালো, তাই না!!

তবে এতটুকু বলাই যায় যে, নিজের আগ্রহ অনুযায়ী এসব সাইটের বিভিন্ন প্রোগ্রামের সাথে যুক্ত থাকলে নিজেকে এতটাই উচুতে নিয়ে যেতে পারবেন দক্ষতার বিচারে একদিন নিজের কাছেই বিশ্বাস হবেনা যে, আপনার ওই অবস্থানের পেছনে এই কোর্সগুলোর ভূমিকা ঠিক কতখানি ছিল ! কারন কোর্সগুলো করতে আপনি স্বাধীন এবং সম্পূর্ণ নিজের ইচ্ছায়ই করবেন। প্রথম থেকেই একদল মানুষের মুখে মুখে র র ধ্বনি বেজেছে, এসব অনলাইন কোর্স দিয়ে কি হবে! কিন্তু দেখুন না, মহামারী ২০২০ সবাইকে কোথায় নিয়ে এলো। এখন ওই সেই আপনাদের পুরোটাই তো অনলাইনে নিয়ে আসতে হলো! লাভ কি হলো! মহামারী চলাকালীন সম্পূর্ণ অনলাইন এডূকেশন সিস্টেম চালু থাকাই উত্তম! এবার নিশ্চয়ই সবাই অনলাইন এডুকেশনের গুরুত্ব হারে হারে টের পাচ্ছেন এবং দেশের যারা অনলাইন লার্নিং কে মেধা কিংবা দক্ষতা যাচাইয়ের মানদন্ড হিসেবে বিবেচনা করেন নি এতোদিন, ধীরে ধীরে তারাও হয়তো অনলাইন লার্নিং কে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করার জন্য নতুন করে ভাবা শুরু করবেন!

আর মহামারী পরবর্তী সময়ে সবথেকে ভালো সমাধান হতে পারে ব্লেন্ডেড লার্নিং! দেশের তথ্য প্রযুক্তি শিক্ষকদের অধিকাংশই হয়তো এ ব্যাপারে ভাবছেন! এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় , ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয় সহ আরো বেশ কটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও এখন এই ব্লেন্ডেড লার্নিং নিয়ে কথা বলছেন।

কেউ কেউ আবার অভিযোগ তোলেন যে, অনেক সময় ধরে স্ক্রিনে মনোযোগ ধরে রাখা কষ্টসাধ্য! কিংবা এজন্য চোখে মারাত্মক রকমের অসুবিধা হতে পারে! এছাড়াও প্রভাব পড়তে পারে মানসিক স্বাস্থ্যের উপরে! কথা সত্য! তবে বলাবাহুল্য যে, আপনার হাতেই সমস্ত কিছুর নিয়ন্ত্রণ! আপনি দিনের ঠিক কতোভাগ সময় অনলাইনে কাটাবেন সে সিদ্ধান্ত কিন্তু একান্তই আপনার নিজস্ব সিদ্ধান্ত! আবার ঠিক যতোটুকু সময় আপনি অনলাইনে কাটাবেন, তার মধ্যে ঠিক কতোটুকু সময় প্রোডাক্টিভ কাজে ব্যায় করবেন আর কতোটুকু সময় নিরর্থক স্ক্রলিং করবেন তাও কিন্তু ঠিক করবেন আপনি নিজেই?

তো অনলাইন এডুকেশন আশীর্বাদ না অভিশাপ? অধিকাংশের মতে আশীর্বাদ হলেও, আশীর্বাদ নাকি অভিশাপ এই বিতর্কের অবসান ঘটানোর প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার  বিষয়টা খানিকটা হলেও/অনেকাংশেই কিন্তু আপনার নিজের উপরেও নির্ভর করে। তাই না?

নিয়াজ মাহমুদ সাকিব

ইংরেজী ভাষা বিভাগ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

বিঃদ্রঃ বাংলাকোষ কোনো সংবাদপত্র নয়, এটি মূলত একটি আর্কাইভ। বাংলাকোষ এ প্রকাশিত সকল তথ্য কপিরাইট এর অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং কোনো পূর্বানুমতি ছাড়া বাংলাকোষের কোনো তথ্য ব্যবহার করা যাবে না। তবে অব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো সূত্রসহ ব্যবহার করতে পারবে।