সুন্দরী নারীতে ভয়! – ভিনাস্ট্রোফোবিয়া !

ভয়!
ভিনাস্ট্রোফোবিয়া- প্রতীকী ছবি
মাহামুদুল হাসান
আমাদের প্রায় সকলের সাথেই কম বেশি  ভয়ংকর ঘটনা প্রায়ই ঘটে থাকে। জোৎস্না রাতে একা ঘর থেকে বেরিয়ে কখনো কি মনে হয়েছে আপনার সামনে কেউ নিশ্চুপ, অনড় দাঁড়িয়ে আছে? কিংবা দাঁত বের করে  নিঃশব্দে হাসছে? সঙ্গে সঙ্গে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো, পরক্ষণেই ভালোমতো তাকিয়ে দেখতে পেলেন সামনে নিছকই একটা গাছ!
কখনো কি ভেবেছেন এমনটা কেন হয়? কেন গাঁয়ে কাটা দিয়ে উঠলো আর কেনইবা বুক ধড়ফড় করছিলো?
উত্তর একটাই, ভয়।
প্রকৃতপক্ষে, ভয় একপ্রকারের অনুভূতি। বিজ্ঞানের ভাষায় বললে হরমোনের প্রবাহ। বিশেষজ্ঞদের মতে, শরীরের বাইরে কিংবা ভেতরে কোনো আসন্ন বিপদ-বিপত্তির আশঙ্কা  তৈরি হলে মস্তিষ্কে এন্ডোরফিন ও ডোপামিন নামের দুই ধরনের বিশেষ রাসায়নিক পদার্থ প্রবাহিত হয়, যা থেকেই  উদ্রেক হয় ভয়ের।
তবে ব্যক্তিভেদে মানুষের মধ্যে বিশেষ কয়েক ধরনের  ভয় বিরাজ করে। যেমন ধরুন, তেলাপোকাকে ভয় পাওয়া। ঘরের মধ্যে তেলাপোকা দেখলে আপনি হয়তো মারতে উদ্যত হবেন। কিন্তু  হতে পারে, আপনার পাশের কেউ একজন এই তেলাপোকা দেখেই ভয়ে লাফিয়ে উঠলো।
এ জাতীয় ভয়কে  বলা হয় ফোবিয়া।
বেশিরভাগ ফোবিয়াই অমূলক, কেননা যে জিনিসটাকে ভয় করা হচ্ছে তা হয়তো কোন ক্ষতিই করতে পারে না।
উড়োজাহাজে উঠতে ভয় পাওয়া, মাকড়সা বা তেলাপোকা ভয় পাওয়া, অথবা গভীর রাতে ভূতের ভয় পাওয়া ইত্যাদি আমাদের  সকলের কাছেই কমবেশি পরিচিত।
কিন্তু সুন্দরী নারীতে ভয়! শুনেছেন কখনো? কথাটা হয়তো অনেকের কাছেই নতুন আবার অনেকের কাছেই অবাক হওয়ার মতো।
কিন্তু এটা রীতিমতো একটা অসুখের নাম। আমাদের চারপাশে এমন অনেকেই আছেন যারা সুন্দরী নারীতে ভয় পান। আর এ ধরনের ফোবিয়া কে বলা হয় ভিনাস্ট্রোফোবিয়া।
ভিনাস্ট্রাফোবিয়ার উৎপত্তি ও সংজ্ঞা
ভিনাস্ট্রাফোবিয়ার অর্থ হলো সুন্দরী মেয়েদের ভয় পাওয়া। এই ফোবিয়ার নামকরণ করা হয়েছে রোমান দেবী ভেনাস থেকে। ভেনাসকে প্রেমের দেবী বলা হয়। এছাড়াও তাকে যৌনতা ও সৌন্দর্যের দেবী হিসেবেও দাবি করা হয়।
মানুষ স্বভাবতই সৌন্দর্যের পূজারী। সুন্দরের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করাই প্রকৃতির নিয়ম। একই সূত্রে সুন্দরী নারীর প্রতি আকর্ষণও খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। তবে ভিনাস্ট্রোফোবিয়ায় আক্রান্ত ব্যাক্তিদের ক্ষেত্রে এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। আকর্ষণীয় নারীদের কাছাকাছি এলে তারা ভয় ও অস্বস্তি বোধ করে। আর এ পরিস্থিতি কাটিয়ে চলতে তারা সুন্দরী মেয়েদের সংস্পর্শ এড়িয়ে যেতে চায়।
ভিনাস্ট্রাফোবিয়াকে গাইনোফোবিয়ার অংশ হিসেবেও বিবেচনা করা হয়। গাইনোফোবিয়া বলতে সকল মেয়েদের ভয় পাওয়াকে বোঝায়। তবে খুবই অল্প সংখ্যক মানুষ এই দুই ফোবিয়ায় আক্রান্ত হয়। এরকম ফোবিয়ায় আক্রান্ত মানুষ অনেক হীনম্মন্যতায় ভোগে। সুন্দরী মেয়েদের সামনে দাঁড়ালে তারা নিজেদের শরীর ও মনের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে না। তারা সত্যিকার অর্থেই অসুস্থ বোধ করে। নিজেদের অনুভূতির উপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে না পারায় তাদের চোখে-মুখে অস্বস্তির চিহ্ন ফুটে ওঠে। দ্রুত নিঃশ্বাস নেওয়া, অনবরত ঘামতে থাকা ইত্যাদি তাদের মাঝে দেখা দেয়।
ভিনাস্ট্রোফোবিয়া কেন হয়?
যে কোন ফোবিয়াই নির্দিষ্ট কোন কারণে মানুষের মাঝে প্রভাব বিস্তার করে। পারিপার্শ্বিক নানা অবস্থা এতে ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে সুন্দরী ও আকর্ষণীয় নারীদের থেকে পাওয়া কোন তিক্ত অভিজ্ঞতা এই রোগের কারণ হতে পারে। যেমন জনসম্মুখে সুন্দরী কোন মেয়ে কতৃক তীব্র অপমান যা তার মনে দাগ কেটে আছে। কিংবা এমন অবস্থায় বড় হওয়া যেখানে সে  নারীদের সঙ্গ থেকে অনেক দূরে ছিলো, কিংবা মানসিক সমস্যা থেকেও এ ফোবিয়ার উৎপত্তি হতে পারে।
সাধারণ মানুষজনের সাথে তাদের আচরণ ও সুন্দরী মেয়েদের সামনে তাদের আচরণের মাঝে বিস্তর পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। এর পেছনে কী কী কারন কাজ করে তা আগেই ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এসবকিছুর দরুণ একজন ভিনাস্ট্রাফোবিকের মস্তিষ্কে নানা রাসায়নিক ক্রিয়া ঘটতে থাকে। এগুলো তার ভাবভঙ্গি থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
 ভিনাস্ট্রোফোবিয়া কি নিরাময় যোগ্য?
যে কোন ফোবিয়াই নিরাময় যোগ্য। আর ফোবিয়াগুলো বাড়াবাড়ি ধরনের আকার ধারণ করলে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শে যাওয়া উচিত। তবে এই সকল ফোবিয়ার চিকিৎসা অন্যান্য অসুখের চিকিৎসার মতো নয়। এগুলো মানসিক রোগের সাথে সম্পর্কিত হওয়ায় কিছু মানসিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করা  সম্ভবপর হয়। মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের  পরামর্শ মোতাবেক বিভিন্ন থেরাপি নেওয়া যেতে পারে।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা দুই ধরনের থেরাপির কথা বলেন। টক থেরাপি ও এক্সপোজার থেরাপি। টক থেরাপির একটি অংশ হলো সিবিটি। এক্ষেত্রে রোগী থেরাপিস্টের সাথে নিয়ম মেনে কথাবার্তা বলেন। খোলাখুলি কথা বার্তা বলে চিন্তা ভাবনার পরিবর্তন আনতে চেষ্টা করেন।
দ্বিতীয় থেরাপি হলো এক্সপোজার। যা একরমের ভয়কে জয় করার মতো। এক্ষেত্রে রোগীকে সরাসরি ভয়ের মুখোমুখি করানো হয়। সুন্দরী ও আকর্ষণীয় মেয়েদের সাথে সময় কাটানোর ব্যবস্থা করা হয়। এভাবে আকর্ষণীয় মেয়েদের সাথে থাকাকে তার জন্য সহজ করা হয়। বিশেষজ্ঞদের দাবী,  তার ভয়ের কারনকে  একেবারে গোড়া থেকেই উপড়ে ফেলতে সক্ষম এ থেরাপি।
এতক্ষণ আলোচনা করা এই ভিনাস্ট্রোফোবিয়ার মতো আরো বিভিন্ন অদ্ভুত ফোবিয়ায় আক্রান্ত অনেকেই রয়েছেন আমাদের চারপাশে। যেমন পানিকে ভয় পাওয়া, যাকে হাইড্রোফোবিয়া তথা জলাতঙ্ক বলা হয়। আবার কেউ কেউ কাগজে ভয় পায়, কেউ বা  আবার কেউ আবার ভয় পায় স্কুলে যাওয়া, যাকে এক কথায় বলা হয়, স্কোলিওনোফোবিয়া।
এ ধরনের অসংখ্য ফোবিয়া রয়েছে, যা শুনতে হাস্যকর মনে হলেও সেসবে আক্রান্ত ব্যাক্তিদের নিয়ে কখনোই হাসাহাসি করা উচিত নয়। এতে আক্রান্ত  ব্যক্তির আত্মবিশ্বাস কমতে থাকবে এবং তার ফোবিয়ার মাত্রাও বৃদ্ধি পাবে। তাই সচেতনতার সঙ্গে ফোবিয়াগুলো মোকাবিলায় মনরোগ বিশেষজ্ঞদের সাথে পরমার্শ করে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়াই আমাদের দায়িত্ব।

বাংলাকোষে লিখুন, আয় করুন... info@banglakosh.com 
বিঃদ্রঃ বাংলাকোষ কোনো সংবাদপত্র নয়, এটি মূলত একটি আর্কাইভ। বাংলাকোষ এ প্রকাশিত সকল তথ্য কপিরাইট এর অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং কোনো পূর্বানুমতি ছাড়া বাংলাকোষের কোনো তথ্য ব্যবহার করা যাবে না। তবে অব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো সূত্রসহ ব্যবহার করতে পারবে।