ফরাসিরা কেন আলোচনা বা আড্ডার শুরুতেই সমস্যার কথা বলে?

Photograph by Remy Gabalda/AFP/GettyImages.

বাংলাকোষ ডেস্ক: ফরাসিদের যেকোনো আলোচনা বা আড্ডার শুরুতে অভিযোগ বা সমস্যার কথা থাকাটা খুব স্বাভাবিক। কিন্তু এই অভিযোগ কাকে, কখন, কিভাবে করা হয় তা একটি অনবদ্য শিল্প।

ফরাসিদের বেশিরভাগ কথাই শুরু হয় কোনো হতাশার বাক্য দিয়ে। ” আজকের আবহাওয়া খারাপ”, “এবছর ভালো উৎপাদন হয়নি”, ” দেশের রাজনীতিবিদরা মূর্খ” – এগুলো তাদের প্রতিদিনকার আড্ডার শুরুর কথা। প্রায় এক দশক আগে ১৯ বছর বয়সী একজন উৎসাহী আমেরিকান হিসেবে যখন প্রথম ফরাসিদের এতো অভিযোগ প্রায় প্রতিদিন শুনতে শুরু করলাম, আমি অনেকটাই দমে গিয়েছিলাম। আমার বারবার মনে হতো, ফরাসিরা কি সবসময়ই এমন নেতিবাচক? কিন্তু যখন এক ফরাসি বন্ধুকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলাম সে জবাব দিল, তারা নেতিবাচক নয়, তারা র‍্যালিউলার্স (ফরাসি শব্দ)।

 

ফ্রান্সে অভিযোগ করার ক্ষেত্রে অনেকধরনের শব্দ ব্যবহার করা হয়। যেমন- ” ছে প্ল্যাইন্ড্রি ” শব্দটি ব্যবহার করা হয় খুব সাধারণ কোনো অভিযোগের ক্ষেত্রে। আবার ” পোর্টার প্লেইটি” শব্দটি খুব ফরমাল বা অফিসিয়ালভাবে অভিযোগ করার সময় ব্যবহার করা হয়। অন্যদিকে ” রেলার” শব্দটি ব্যবহার করা হয় একদমই মজা করে কোনো অভিযোগ করার ক্ষেত্রে।

অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির একজন সিনিয়র ফ্রেঞ্চ লেকচারার ডক্টর গেমা কিং বলেন, তুমি যখন কোনো কিছু করার সময় “রেলার” করছো মানে তুমি তখনও কাজটি করছো। কিন্তু তুমি কাজটি “পোর্টার প্লেইটি” করছো মানে তুমি আর কাজটি করবে না এবং এক্ষেত্রে কেউ একজন অবশ্যই জানতে চাইবে কেন করছো না।

 

ফ্রান্সে অভিযোগ করা বা সমস্যা বলা খুবই সাধারণ বিষয়। এখানে যেকেউ কোনো রেস্তোরাঁয় বসে শুরুতেই তাদের খারাপ সার্ভিসের কথা সরাসরি বলতে পারে। জুলি বার্লো নামক একজন কানাডিয়ান সাংবাদিক বলেন, আমেরিকায় কোনো কিছু নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করা মানেই যেকোনো আলোচনার সমাপ্তি ঘটা। যেখানে ফরাসিরা মনে করে নেতিবাচক মন্তব্য করা মানে অন্যদের আরও বেশি মতামত প্রত্যাশা করা। তিনি আরও বলেন, দক্ষিণ আমেরিকানরা এরকম সমালোচনা বা সরাসরি অভিযোগে অনেকটাই অস্বস্তিতে পড়েন। যেখানে ফরাসিরা অতি আশাবাদী না হয়ে “রেলার” এর মাধ্যমে অনেকটাই বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়ে এগিয়ে থাকেন।

 

ফরাসিদের এই নেতিবাচক সমালোচনা ইংরেজদের কাছেও অনেকটা অস্বস্তিকর, যেখানে অনেকেই মনে করেন নেতিবাচকতাই আরো বেশি নেতিবাচকতা সৃষ্টি করে। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, ফরাসিদের এরূপ আচরণ বরং তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে অনেক ফলদায়ক। কারণ এক্ষেত্রে প্রত্যেকে নির্দিষ্ট করে তাদের সমস্যা বা অভিযোগ প্রকাশ করতে পারছে, কোনো চাপা ক্ষোভ বা রাগ থাকছে না। ২০১১ সালে টেক্সাস ইউনিভার্সিটির এক গবেষণায় দেখা যায়, নেতিবাচক অনুভূতি চাপা দিতে গিয়ে মানুষ আরো বেশি আক্রমণাত্মক আচরণ করা শুরু করে।

 

কিন্তু এসবের অর্থ এই না অভিযোগ করা বা সমালোচনা খুব ইতিবাচক কিছু। বরং সমালোচনা অনেকসময় আমাদের নেতিবাচকতার দিকেই বেশি ঠেলে দেয়। কিন্তু ফরাসিরা “রেলার” এর মাধ্যমে এগুলো অনেকটাই এড়িয়ে চলে। কারণ তারা তাদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে খুব কমই অভিযোগ করে। তাদের বেশিরভাগ অভিযোগ থাকে বহির্বিশ্ব বা বাইরের সমস্যা নিয়ে।

 

সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, ৪৮% ফরাসিরা অভিযোগ করে তাদের সরকারের কার্যক্রম নিয়ে, ২৩% অভিযোগ করে কেউ ফিরতি কল না পেলে, ১৩% অভিযোগ গাড়ির চাবি কিংবা ফোন হারিয়ে যাওয়া বিষয়ক এবং মাত্র ১২% তাদের সন্তানদের সমস্যাবিষয়ক।

 

এ বিষয়ে বার্লো বলেন, আমার মনে হয় ফরাসিরা তাদের নিজেদের নিয়ে খুব আশাবাদী ও ইতিবাচক কিন্তু তারা তাদের দেশের প্রতি খুবই কঠোর। তিনি আরও বলেন, ফরাসিদের কোনো পার্টিতে ফ্রান্সের প্রশংসা করতে যাওয়া মানে হাসির পাত্র হওয়া।

 

মজার ব্যাপার হচ্ছে ফরাসিরা কিন্তু সবসময় সমাধান কিংবা কোনো পরিবর্তনের জন্যও অভিযোগ করে না। বরং ফরাসি সংস্কৃতির এই ধারাকে বজায় রাখার এটি একটি কৌশল মাত্র। এর মাধ্যমে মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক আরো গভীর হয়। তারা আরও বেশি নিজেদের প্রকাশ করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। ইউনিভার্সিটি অব ওকলাহোমার এক গবেষণায় দেখা গেছে, নিজের সমস্যাগুলো প্রকাশের মাধ্যমে মানুষে মানুষে সংযোগ বা যোগাযোগ অনেক বাড়ে যেটি সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে খুবই ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।

 

এক্ষেত্রে আমি আমার নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে পারি। আমার রেসিডেন্সি কার্ডটি সেখানের থানায় রিনিউ করতে গিয়ে যে পরিমাণ ঘোরাঘুরি করতে হয়েছে তার অভিজ্ঞতা আমি সেখানের যে কাউকে নির্বিধায় বলতে পারবো, তারা আমার সমস্যার কথা খুব মনোযোগ দিয়ে শুনবেন এবং নিজেদের মতামত দিবেন।

 

কয়েক বছর ফ্রান্সে কাটানোর পর সেখানের স্থানীয়দের সাথে বেশ ভালো সম্পর্ক হয়ে গিয়েছিল। আমি কখনো ভাবতে পারিনি সেখানে থাকাকালীন আমি এতো সমস্যা তাদের সাথে শেয়ার করতে পারবো। আসলে কেউ অভিযোগ করা মানেই সেখানে আসলেই সত্যিকার অর্থে কোনো সমস্যা আছে । আর সমস্যা বলা মানেই সমাধানের রাস্তাও খুজতে থাকা।

বিঃদ্রঃ বাংলাকোষ কোনো সংবাদপত্র নয়, এটি মূলত একটি আর্কাইভ। বাংলাকোষ এ প্রকাশিত সকল তথ্য কপিরাইট এর অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং কোনো পূর্বানুমতি ছাড়া বাংলাকোষের কোনো তথ্য ব্যবহার করা যাবে না। তবে অব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো সূত্রসহ ব্যবহার করতে পারবে।